শিশুর জন্মের পর মায়ের দুধ খাওয়ানোকে সবচেয়ে স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া হিসেবে ধরা হলেও বাস্তবে অনেক নারী এই পথকে কঠিন অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেন। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ধারণা ছিল, খুব অল্প সংখ্যক মায়ের শরীরেই প্রকৃত অর্থে দুধ কম তৈরি হয়। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, বাস্তবতা হয়তো ভিন্ন। বিজ্ঞানীরা এখন মনে করছেন, বহু নারী আসলে জৈবিক কারণেই পর্যাপ্ত দুধ উৎপাদন করতে পারেন না।
সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নত দেশগুলোতে যারা সন্তান জন্মের পর বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করেন, তাদের একটি বড় অংশ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা বন্ধ করে দেন। কারণ হিসেবে বেশিরভাগ নারী মনে করেন, তাদের শরীরে পর্যাপ্ত দুধ তৈরি হচ্ছে না। আগে চিকিৎসকেরা এটিকে মানসিক উদ্বেগ বা ভুল পদ্ধতির সমস্যা হিসেবে দেখলেও এখন বিষয়টি নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
দুধ উৎপাদনের মূল রহস্য

মানবদেহের স্তনগ্রন্থিতে থাকা বিশেষ কোষ ‘ল্যাক্টোসাইট’ দুধ উৎপাদনের জন্য দায়ী। গর্ভাবস্থার সময় এই কোষ দ্রুত বাড়তে থাকে এবং সন্তান জন্মের কয়েকদিন পর থেকেই দুধ তৈরি শুরু করে। বিজ্ঞানীরা এখন বুঝতে পারছেন, অনেক নারীর ক্ষেত্রে এই কোষের সংখ্যা কম থাকে অথবা কোষগুলো ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না।
গবেষকদের মতে, কিছু কোষের ভেতরে জিনগত পরিবর্তন বা ক্ষতি তৈরি হলে সেগুলো ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে যায়। ফলে পর্যাপ্ত দুধ উৎপাদন ব্যাহত হয়। কিছু ক্ষেত্রে শরীরের কোষ মেরামতকারী প্রক্রিয়াও ঠিকভাবে কাজ করে না, যার কারণে সমস্যা আরও বাড়ে।
গর্ভকালীন জটিলতার প্রভাব
নতুন গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টার সমস্যা থাকলে তা ভবিষ্যতে দুধ উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। প্লাসেন্টা থেকেই এমন অনেক হরমোন তৈরি হয়, যা স্তনগ্রন্থিকে দুধ তৈরির জন্য প্রস্তুত করে।
যেসব নারীর প্রি-এক্লাম্পসিয়া, ডায়াবেটিস বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত সমস্যা থাকে, তাদের মধ্যে দুধ কম হওয়ার ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। গবেষকেরা বলছেন, এসব শারীরিক অবস্থা স্তনগ্রন্থির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে।

প্রদাহ ও পুষ্টির ঘাটতির সম্পর্ক
শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, শরীরের ভেতরের প্রদাহও দুধ উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। স্থূলতা বা অটোইমিউন রোগের কারণে শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান স্তনগ্রন্থিতে পৌঁছাতে বাধা পায়। এতে দুধ তৈরির প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে।
কিছু নারীর ক্ষেত্রে জিনগত কারণেও জিঙ্কসহ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সঠিকভাবে দুধে প্রবেশ করতে পারে না। এর প্রভাব পড়ে শিশুর পুষ্টির পাশাপাশি মায়ের দুধ উৎপাদন ক্ষমতার ওপরও।
কলঙ্ক কমাতে পারে নতুন গবেষণা

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই গবেষণা শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত খুলছে না, একই সঙ্গে বহু নারীর মানসিক চাপও কমাতে পারে। এতদিন অনেক মা মনে করতেন, পর্যাপ্ত চেষ্টা না করার কারণেই তারা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারছেন না। কিন্তু এখন স্পষ্ট হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই এটি সম্পূর্ণ জৈবিক সমস্যা।
বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে এমন কিছু পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন, যা ভবিষ্যতে দ্রুত শনাক্ত করতে পারবে কোনো মা পর্যাপ্ত দুধ উৎপাদন করতে পারছেন কি না। এতে চিকিৎসকরা আগেভাগেই সঠিক পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাতৃদুগ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিনের সামাজিক চাপ ও অপরাধবোধ কমাতে এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ সব মা একই শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে সন্তান জন্ম দেন না, আর সেটিই এখন বিজ্ঞানের আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















