ভারতের মুদ্রাবাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির দাম দ্রুত কমতে থাকায় অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। ইতোমধ্যে রুপির মান ৯৬ ছাড়িয়ে গেছে এবং পরিস্থিতি একইভাবে চলতে থাকলে খুব দ্রুতই এক ডলারের বিপরীতে ১০০ রুপির মানসিক সীমা ভেঙে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে শুধু বৈশ্বিক চাপ নয়, গত কয়েক বছরে রুপিকে কৃত্রিমভাবে স্থিতিশীল রাখার নীতিও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ভারতীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ব্যাপক হস্তক্ষেপ করে রুপিকে ৮১ থেকে ৮৩-এর মধ্যে আটকে রাখে। ফলে স্বাভাবিক বাজারচাপ জমতে জমতে এখন বড় ধাক্কা হিসেবে সামনে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন চাপ তৈরি করেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা বেড়েছে, একই সঙ্গে মূলধনের প্রবাহেও পরিবর্তন এসেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে। চলতি বছরের শুরু থেকে রুপির মান ইতোমধ্যে প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে।
নীতিনির্ধারকদের একাংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে রুপিকে বাস্তব অবস্থার চেয়ে শক্তিশালী দেখানোর চেষ্টা এখন উল্টো ফল দিচ্ছে। কারণ বাজারে স্বাভাবিক অবমূল্যায়ন না হওয়ায় চাপ একসঙ্গে জমে বড় আকারে বিস্ফোরিত হচ্ছে।
রিজার্ভ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক বরাবরই দাবি করে আসছে, তারা নির্দিষ্ট কোনো বিনিময় হার ধরে রাখতে চায় না। তাদের মূল লক্ষ্য শুধু অতিরিক্ত ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করা। তবে বাজারসংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, বাস্তবে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে রুপিকে স্থিতিশীল রাখা হয়েছিল।

সে সময় বৈদেশিক লেনদেনে উদ্বৃত্ত থাকায় রুপির শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু পরে যখন চাপ তৈরি হয়, তখন সেই স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে এখন অবমূল্যায়নের গতি আরও বেশি চোখে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু অস্থায়ী পদক্ষেপ নিয়ে এই সংকট সামাল দেওয়া যাবে না। ভারতের অর্থনীতিতে কাঠামোগত কিছু সমস্যা রয়েছে, যেগুলো সমাধান না করলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে চলমান অবমূল্যায়ন জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন, আগামী বছর নয়, চলতি বছরেই রুপি এক ডলারের বিপরীতে ১০০ স্পর্শ করতে পারে। আর একবার সেই সীমা অতিক্রম করলে বাজারে আরও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ভারতের জন্য বড় অর্থনৈতিক বার্তা
রুপির এই পতন শুধু মুদ্রাবাজারের ঘটনা নয়, বরং ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থারও বড় সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি, বিদেশি মূলধনের অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। এখন ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাজারের আস্থা ধরে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথ তৈরি করা।
রুপির দরপতন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ভারতে। ডলারের বিপরীতে ১০০ ছোঁয়ার আশঙ্কায় অর্থনীতি ও বাজারে তৈরি হয়েছে নতুন চাপ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















