স্কুলে দুপুরের খাবারের ঘণ্টা বাজলেই একসময় ছুটে যেত শিশুরা। গরম ভাত, ডাল আর তরকারির গন্ধে ভরে উঠত শ্রেণিকক্ষের বারান্দা। কিন্তু ভারতের বিহারের সাহারসা জেলার একটি গ্রামের স্কুলে এখন সেই দৃশ্য বদলে গেছে। খাবারের পাত্র সামনে এলেই শিশুদের চোখেমুখে ফুটে উঠছে ভয়। কেউ থালা হাতে নিচ্ছে না, কেউ দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে, আবার কেউ বাড়ি থেকে আনা শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছে।
গত ৭ মে বিহারের বালুয়াহা গ্রামের একটি সরকারি মধ্যবিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। অভিযোগ ওঠে, শিক্ষার্থীদের জন্য রান্না করা ডালের মধ্যে মৃত সাপের বাচ্চার মতো কিছু দেখা যায়। সেই দৃশ্য দেখেই কয়েকজন শিক্ষার্থী চিৎকার শুরু করে। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ভয়। অনেকে খাবার ফেলে দেয়, কেউ বমি করতে শুরু করে, আবার কেউ পেটব্যথার অভিযোগ তোলে। পরে শতাধিক শিশুকে স্থানীয় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হয়।
আতঙ্ক এখনো কাটেনি
ঘটনার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও স্কুলের পরিবেশ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। শিশুদের অনেকেই এখন আর স্কুলের খাবারে হাত দিতে চায় না। অভিভাবকেরাও আতঙ্কে সন্তানদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন, স্কুলের রান্না করা খাবার যেন না খায়।
এক শিক্ষার্থী জানায়, তার মা প্রতিদিন বাড়ি থেকে খাবার বেঁধে দেন। কারণ তিনি ভয় পান, আবার যদি এমন কিছু ঘটে। আরেকজন শিশুর কণ্ঠে ছিল সরল আতঙ্ক—“খাবারের দিকে তাকালেই ভয় লাগে।”
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, উদ্বেগে আছেন শিক্ষক ও রান্নার কাজে যুক্ত কর্মীরাও। স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা জানান, ঘটনার পর থেকে প্রতিদিন শিক্ষকরা শিশুদের সামনে আগে খাবার খেয়ে দেখাচ্ছেন। তবুও শিক্ষার্থীদের আস্থা ফিরছে না।
যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে ভয়
ঘটনার দিন স্কুলে উপস্থিত ছিল পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী। দুপুরের খাবার পরিবেশনের সময় একজন রাঁধুনি ডালের পাত্রে অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পান। তিনি দ্রুত শিশুদের খেতে নিষেধ করেন। কিন্তু ততক্ষণে কিছু শিক্ষার্থী খাবার মুখে তুলে ফেলেছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হৈচৈ শুরু হয়।
শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এক শিক্ষার্থী চিৎকার করে বলে ওঠে খাবারে অদ্ভুত কিছু দেখা গেছে। এরপর সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। দ্রুত স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পুলিশ ও প্রশাসনকে খবর দেওয়া হয়। অসুস্থ শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হলেও আতঙ্ক রয়ে যায় মানুষের মনে।

গ্রামের মানুষের ক্ষোভ
ঘটনার পর শুধু শিক্ষার্থী নয়, অভিভাবকদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। যেসব শিশুরা সেদিন স্কুলে উপস্থিত ছিল না, তাদের পরিবারের সদস্যেরাও স্কুলে এসে বিক্ষোভ দেখান। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, শিশুদের খাবারের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে কেন এত অবহেলা থাকবে।
এক অভিভাবক বলেন, গরিব মানুষের সন্তান বলেই কি তাদের জীবন এত সস্তা? আরেকজনের কণ্ঠে ছিল অসহায় বেদনা—“জীবন একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না।”
খাবার সরবরাহ নিয়ে প্রশ্ন
বিদ্যালয়টিতে খাবার সরবরাহ করে একটি বেসরকারি সংস্থা। তাদের রান্নাঘর স্কুল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য সেখানে রান্না করা হয়। সংস্থাটির দাবি, তারা সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনেই খাবার প্রস্তুত করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনার পর সেই দাবি নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
স্থানীয়রা বলছেন, এত বিপুল সংখ্যক শিশুর খাবার প্রস্তুতের সময় যথাযথ তদারকি না থাকলে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে। খাবারের মান পরীক্ষা এবং পরিবহনের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বলেও মনে করছেন অনেকে।
পুরোনো ক্ষত আবার সামনে
বিহারে স্কুলের মধ্যাহ্নভোজ নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। গত কয়েক বছরে একাধিকবার খাবারে টিকটিকি, পোকামাকড় কিংবা বিষাক্ত কিছু পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনেক ঘটনায় অসুস্থ হয়েছে শত শত শিশু। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২০১৩ সালে। সেবার দূষিত খাবার খেয়ে ২৩ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছিল। সেই ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
তারপরও কেন একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসছে, সেই প্রশ্ন এখন আবার জোরালো হয়ে উঠেছে। শিক্ষাব্যবস্থা ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
তদন্ত চলছে, অপেক্ষা উত্তর পাওয়ার
প্রশাসন ইতোমধ্যে কয়েকজন শিক্ষক ও রান্নার কাজে যুক্ত কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। খাবারের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, পরীক্ষার ফল হাতে পেলেই নিশ্চিতভাবে জানা যাবে খাবারে আসলে কী ছিল।
তবে গ্রামের মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অন্য জায়গায়। তারা জানতে চাইছেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটার নিশ্চয়তা কে দেবে? কারণ শিশুদের জন্য স্কুল শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়, নিরাপদ আশ্রয়ও হওয়ার কথা। আর সেই জায়গাতেই যদি খাবারের থালায় ভয় লুকিয়ে থাকে, তাহলে শিশুদের মন থেকে আতঙ্ক মুছে ফেলা সহজ হবে না।
বিহারের একটি সরকারি স্কুলে দুপুরের খাবারে সাপের অভিযোগ ঘিরে আতঙ্কে রয়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে নতুন প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















