দেশজুড়ে উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছ কাটার বিরুদ্ধে এবার আরও জোরালো হয়ে উঠছে নাগরিকদের প্রতিবাদ। কোথাও রাস্তা চওড়া করার জন্য, কোথাও বড় মেলা বা বিপণিবিতান তৈরির জন্য হাজার হাজার পুরনো গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। আর এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন শহরে সাধারণ মানুষ, পরিবেশকর্মী ও তরুণ প্রজন্ম একসঙ্গে রাস্তায় নামছেন।
উত্তরাখণ্ড থেকে রাজস্থান, মহারাষ্ট্র থেকে দিল্লি— একের পর এক এলাকায় গাছ বাঁচানোর দাবিতে মানববন্ধন, নীরব প্রতিবাদ, অনলাইন প্রচার এবং স্বাক্ষর অভিযানের মতো কর্মসূচি দেখা যাচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, শুধু নতুন চারা লাগিয়ে পুরনো গাছ কাটার ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
উত্তরাখণ্ডে গাছ কাটার বিরুদ্ধে ক্ষোভ
উত্তরাখণ্ডে দেরাদুন-ঋষিকেশ সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য কয়েক হাজার গাছ কাটার পরিকল্পনা ঘিরে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। গত বছর দেরাদুনে মানুষ সাদা পোশাক পরে এবং মুখ কালো কাপড়ে বেঁধে নীরব প্রতিবাদে অংশ নেন। অনেকেই কাটা পড়া গাছের ডাল কাঁধে নিয়ে প্রতীকী শোকমিছিলও করেন।
পরিবেশ আন্দোলনকারীদের দাবি, গত কয়েক বছরে রাজ্যে কয়েক হাজার পুরনো শাল, বট, জাম, খয়ের ও অন্যান্য বড় গাছ কাটা হয়েছে। এর ফলে পাহাড়ি এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে দেরাদুন ও মুসৌরির মতো অঞ্চলে সবুজ আচ্ছাদন কমে যাওয়ার প্রভাব এখন স্পষ্ট।
তাদের অভিযোগ, পর্যটন বাড়ানোর নামে যেভাবে অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে, তাতে প্রকৃতি সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে।
জয়পুরে বনভূমি ঘিরে আন্দোলন
রাজস্থানের জয়পুরেও বড় একটি বনভূমি রক্ষায় নাগরিক আন্দোলন জোরদার হয়েছে। বিমানবন্দরের কাছে একটি বিপণিবিতান, আর্থিক প্রযুক্তি পার্ক ও অন্যান্য নির্মাণ প্রকল্পের জন্য শত শত গাছ কাটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, ওই বনাঞ্চলে হাজারের বেশি দেশীয় গাছ, অসংখ্য ভেষজ উদ্ভিদ এবং বহু প্রজাতির পাখি ও প্রাণীর আবাস রয়েছে। গ্রীষ্মকালে জয়পুরের প্রচণ্ড তাপমাত্রার মধ্যে এই বনই শহরকে কিছুটা শীতল রাখে।
এই বন রক্ষার দাবিতে একসময় হাজারের বেশি মানুষ মানববন্ধনে অংশ নেন। অনলাইনেও আন্দোলনটি ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে।

মহারাষ্ট্র ও নিকোবরেও আশঙ্কা
মহারাষ্ট্রে ধর্মীয় উৎসব ও উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরেও কয়েক হাজার গাছ কাটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করেই কিছু এলাকায় গাছ কাটা শুরু হয়েছিল। পরে আদালত হস্তক্ষেপ করে সাময়িকভাবে সেই প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়।
অন্যদিকে নিকোবর দ্বীপেও বড় বন্দর প্রকল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ গাছ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, এমন প্রকল্প শুধু বন নয়, পুরো দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
গাছ বাঁচানোর লড়াইয়ে কিছু সাফল্যও
সব প্রতিবাদের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক খবর এসেছে। হায়দরাবাদের কাছে বহু পুরনো বটগাছ কাটার পরিকল্পনা নাগরিক আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত থেমে যায়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর পরিবেশ আদালত গাছ রক্ষার পক্ষে রায় দেয়।
দিল্লিতেও বহু বছরের আন্দোলনের পর রাজধানীর একটি বড় বনাঞ্চল সংরক্ষিত বন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। পরিবেশকর্মীদের মতে, এই ধরনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
পরিবেশবিদদের সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরনো বড় গাছ শুধু ছায়া দেয় না, শহরের তাপমাত্রা কমায়, দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। রাস্তার ধারের পুরনো গাছগুলো বহু শহরের সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত পরিচয়ের অংশও বটে।
তাদের মতে, উন্নয়নের প্রয়োজন অবশ্যই আছে, কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি প্রকৃতিকে ধ্বংস করে এগোয়, তাহলে ভবিষ্যতে তার মূল্য আরও ভয়াবহ হতে পারে।
উন্নয়নের নামে দেশজুড়ে গাছ কাটার বিরুদ্ধে নাগরিকদের প্রতিবাদ বাড়ছে। পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন শহরে নতুন আন্দোলনের ঢেউ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















