ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে একটি সড়ক এখন শুধু যাতায়াতের পথ নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রতীক। ড্রুজকিভকা থেকে কোস্তিয়ানতিনিভকা পর্যন্ত বিস্তৃত এই পথকে ইউক্রেনীয় সেনারা বলছেন ‘জীবনের সড়ক’। কিন্তু নামের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুব কম। পোড়া গাড়ি, বিধ্বস্ত অবকাঠামো আর আকাশজুড়ে ঘুরে বেড়ানো রুশ ড্রোন—সব মিলিয়ে এলাকাটি এখন এক ভয়ংকর যুদ্ধক্ষেত্র।
ডনবাস অঞ্চলের এই রাস্তাটি ইউক্রেনীয় সেনাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ। সামনের সারিতে অবস্থান নেওয়া সেনাদের কাছে খাবার, অস্ত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিতে এই পথ ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় মানুষ নয়, ছোট রোবট গাড়ির মাধ্যমেও সরঞ্জাম পাঠানো হচ্ছে। কারণ খোলা রাস্তায় চলাফেরা মানেই এখন ড্রোন হামলার ঝুঁকি।
ড্রোনে বদলে গেছে যুদ্ধের চেহারা

ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রকে সবচেয়ে শক্তিশালী মনে করা হলেও এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ড্রোন প্রযুক্তি পুরো যুদ্ধের কৌশল পাল্টে দিয়েছে। বড় যানবাহন সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। তাই অনেক সেনা এখন পায়ে হেঁটে চলাচল করছেন, যেন আকাশ থেকে নজরে না পড়েন।
রুশ ড্রোনের শব্দ শুনলেই সেনারা দ্রুত গাছপালা বা ঝোপের আড়ালে আশ্রয় নেন। রাস্তার ওপর তৈরি জালের মতো সুরক্ষা কাঠামোও সবসময় কাজে আসে না। অনেক সময় দ্রুত জঙ্গল বা গাছের আড়ালে যেতে হলে সেই জাল কেটে বের হতে হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো নিজেকে ছোট ও অদৃশ্য রাখা।
পাঁচ ঘণ্টার আতঙ্ক
একটি ছোট পথ পাড়ি দিতে ইউক্রেনীয় সেনাদের সঙ্গে থাকা একটি দলকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় ব্যয় করতে হয়েছে। এই সময়ে অন্তত ১৪ বার ড্রোন হামলা বা খুব কাছাকাছি বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। কোথাও গুলির শব্দ, কোথাও মাথার ওপর ঘুরতে থাকা ড্রোন—সব মিলিয়ে পুরো এলাকা যেন একটানা আতঙ্কে ঢেকে আছে।

সেনারা জানিয়েছেন, ড্রোনের শব্দ এত বেশি শোনা যায় যে কিছু সময় পর কোনটা বাস্তব আর কোনটা কল্পনা, সেটাই বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও সতর্কতা কমানোর সুযোগ নেই। কারণ এক মুহূর্তের অসাবধানতাই প্রাণঘাতী হতে পারে।
ক্লান্ত সৈনিক, বদলে যাওয়া বাস্তবতা
ফ্রন্টলাইন থেকে ফিরে আসা অনেক ইউক্রেনীয় সেনাকে ক্লান্ত ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় ট্রেঞ্চে কাটানো, চারপাশে ড্রোন হামলা ও গোলাবর্ষণ—সব মিলিয়ে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এক তরুণ প্রযুক্তি অপারেটর জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে তিনি এমন বাস্তবতার কথা কখনও ভাবেননি। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে এই কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে।
যুদ্ধের নতুন বাস্তবতায় ইউক্রেন এখন প্রযুক্তিনির্ভর কৌশলে বেশি জোর দিচ্ছে। সীমিত জনবল নিয়ে তারা ড্রোন, রোবট ও দ্রুত অভিযোজনের মাধ্যমে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে টিকে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, তবু অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইউক্রেন অন্তত পরিস্থিতি পুরোপুরি হাতছাড়া হতে দেয়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















