সিঙ্গাপুরে পাখির অস্বাভাবিক মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক কাচঘেরা ভবন, বাসস্টপ ও বিভিন্ন মানবসৃষ্ট কাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষ এখন পাখি মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরেই মৃত্যুর সংখ্যা নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি চারটি পেরেগ্রিন ফ্যালকন ছানার মধ্যে দুটি মারা যাওয়ার ঘটনা নতুন করে বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি ছানার মাথা ও ঠোঁটে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়, অন্যটির শরীরে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, উভয়ই কোনো শক্ত কাঠামোর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মারা গেছে।
মৃত পাখির সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত
সিঙ্গাপুরের একটি প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের গবেষক ইয়েন ই পরিচালিত ‘ডেড বার্ড হটলাইন’-এ ২০২৫ সালে প্রায় ৬৫০টি আহত বা মৃত পাখির খবর জমা পড়েছে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। গবেষকদের ধারণা, ২০২৬ সালে সেই সংখ্যাও ছাড়িয়ে যেতে পারে। বছরের প্রথম দিকের হিসাবই আগের বছরের তুলনায় বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আংশিকভাবে মানুষের সচেতনতা বাড়ায় রিপোর্টের সংখ্যা বেড়েছে। তবে একই সঙ্গে নগরায়ণ ও কাচনির্ভর স্থাপত্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
কাচের ভবন কেন এত বিপজ্জনক
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় কাচের দেয়াল আকাশ ও গাছপালার প্রতিফলন তৈরি করে। ফলে পাখিরা সেটিকে খোলা আকাশ বা নিরাপদ পরিবেশ ভেবে সোজা উড়ে গিয়ে ধাক্কা খায়। রাতের বেলায় শহরের তীব্র আলোও পরিযায়ী পাখিদের বিভ্রান্ত করে। তারা সাধারণত তারা বা প্রাকৃতিক আলোর সাহায্যে পথ নির্ধারণ করে থাকে।
সবচেয়ে বেশি মৃত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে স্থানীয় গোলাপি-ঘাড় সবুজ কবুতর। অন্যদিকে পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে ব্লু-উইংড পিট্টার মৃত্যুর ঘটনা বেশি দেখা যাচ্ছে।
পরিযায়ী পাখিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথ
সিঙ্গাপুর পূর্ব এশিয়া-অস্ট্রেলেশিয়া উড়ালপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই পথে প্রতিবছর হাজার হাজার পাখি আর্কটিক অঞ্চল থেকে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত যাতায়াত করে। ফলে শহরের উঁচু ভবন ও আলোকদূষণ তাদের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হচ্ছে।

পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের সংকেত
পরিবেশবিদদের মতে, পাখির মৃত্যু শুধু জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি নয়, এটি পরিবেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যেরও ইঙ্গিত। পাখির শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকসহ নানা দূষকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। তাই পাখিদের অবস্থার অবনতি মানুষের জন্যও সতর্কবার্তা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জলাভূমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষার ওপর জোর দিচ্ছেন। তাদের মতে, উন্নয়নের চাপে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে, যা পরিযায়ী পাখিদের অস্তিত্বের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করছে।
সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান
গবেষকরা বলছেন, মৃত পাখির প্রতিটি তথ্য ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব নমুনা থেকে ডিএনএ ও প্রজাতি সম্পর্কিত মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়, যা ভবিষ্যতে পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার আগাম সংকেত দিতেও সাহায্য করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















