০২:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
হাইলাইট: অদ্ভুত মামলা, নজিরবিহীন কারসাজি কান পেরিয়ে ‘অম্মা আরিয়ান’-এর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সীমান্ত শুধু নিরাপত্তার রেখা নয়, বেঁচে থাকারও পথ হরমুজের ছায়ায় বদলে যাচ্ছে জ্বালানি রাজনীতির মানচিত্র পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, নাকি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক প্রজন্ম? মরক্কোর বিশ্বকাপ স্বপ্নে অস্থিরতা, আফ্রিকা সেরার মুকুট নিয়েও বাড়ছে অনিশ্চয়তা ব্রাজিলের ২৪ বছরের অপেক্ষা, নতুন কোচ আনচেলত্তির হাত ধরে বিশ্বকাপ স্বপ্নের নতুন যাত্রা পাখির মৃত্যুর রেকর্ড ভাঙছে সিঙ্গাপুরে, কাচঘেরা ভবনই বড় হুমকি মালয়েশিয়ার জোট রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা, আগাম নির্বাচনের ইঙ্গিত আনোয়ারের চীনের পিংলু খাল খুলছে সেপ্টেম্বরে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যে নতুন গতি

হরমুজের ছায়ায় বদলে যাচ্ছে জ্বালানি রাজনীতির মানচিত্র

  •  রন বুসো
  • ০২:০৪:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
  • 5

বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বহু দশক ধরে একটি অলিখিত নিয়ম কাজ করেছে—তেল মানেই ডলার, আর ডলার মানেই আমেরিকার আর্থিক প্রভাব। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা সেই কাঠামোকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা শুধু জ্বালানি সরবরাহ নয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা বা অবরোধের অর্থ শুধু পরিবহন ব্যাহত হওয়া নয়, বরং পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হওয়া। এশিয়ার দেশগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। কারণ দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তাদের শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।

এই বাস্তবতায় অনেক দেশ পুরোনো বাজারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে সরাসরি রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সমঝোতার পথে হাঁটছে। তেল কোম্পানি, আন্তর্জাতিক বাজার বা প্রচলিত ট্রেডিং ব্যবস্থার বদলে এখন সরকারগুলো নিজেই সরবরাহ নিশ্চিত করার কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে। এর ফলে জ্বালানি বাণিজ্য ধীরে ধীরে আরও রাজনৈতিক এবং কম স্বচ্ছ হয়ে উঠছে।

Hormuz shock puts Bangladesh's energy security at risk | The Business  Standard

বিশেষ করে এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো এখন বুঝতে পারছে যে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই তারা দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, কৌশলগত মজুত এবং দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার দিকে ঝুঁকছে। ভারত, চীন, জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর সাম্প্রতিক তৎপরতা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডলারের বিকল্প খোঁজার প্রবণতা। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য আমেরিকাকে বিশাল কূটনৈতিক শক্তি দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে শুরু করে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ—সব ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটনের ক্ষমতার বড় ভিত্তি ছিল এই “পেট্রোডলার” ব্যবস্থা।

কিন্তু যখন কোনো দেশ মনে করে ডলারনির্ভর কাঠামো তার জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে, তখন বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজার চাপ বাড়ে। রাশিয়া, ইরান কিংবা ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বহু রাষ্ট্রকে নতুন হিসাব করতে বাধ্য করেছে। এখন ধীরে ধীরে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, পণ্য বিনিময়ভিত্তিক চুক্তি কিংবা বিকল্প আর্থিক চ্যানেলের ব্যবহার বাড়ছে।

Oil Now Makes Our Dollar-Based Global Economy Inflammable - Fair Observer

যদিও বাস্তবে ডলারের অবস্থান এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নিকট ভবিষ্যতে অন্য কোনো মুদ্রা সেটিকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারবে না, তবুও বর্তমান পরিস্থিতি একটি ধীর কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য যদি ক্রমশ দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক চুক্তিনির্ভর হয়ে ওঠে, তাহলে একসময়ের একক বাজারব্যবস্থা আরও খণ্ডিত হয়ে পড়বে।

এর ফলও হবে বহুমাত্রিক। প্রথমত, তেলের দামের স্বচ্ছতা কমতে পারে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক সম্পর্ক জ্বালানি বাণিজ্যে আরও বড় ভূমিকা নেবে। তৃতীয়ত, বাজারের পরিবর্তে রাষ্ট্রনির্ভর দর-কষাকষি বাড়বে, যা দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

একই সঙ্গে আমেরিকার জন্যও এটি একটি সতর্কবার্তা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি উৎপাদক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু শুধু উৎপাদনশক্তি নয়, আর্থিক কাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণও ছিল তার বৈশ্বিক নেতৃত্বের অন্যতম ভিত্তি। যদি সেই কাঠামো ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করে, তাহলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎও আরও জটিল হয়ে উঠবে।

সবচেয়ে বড় কথা, বর্তমান সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে জ্বালানি এখন আর শুধু অর্থনৈতিক পণ্য নয়; এটি কৌশলগত অস্ত্র, কূটনৈতিক হাতিয়ার এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার অন্যতম নির্ধারক। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাত হয়তো একদিন থামবে, কিন্তু এর প্রভাব বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন থেকে যাবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হাইলাইট: অদ্ভুত মামলা, নজিরবিহীন কারসাজি

হরমুজের ছায়ায় বদলে যাচ্ছে জ্বালানি রাজনীতির মানচিত্র

০২:০৪:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বহু দশক ধরে একটি অলিখিত নিয়ম কাজ করেছে—তেল মানেই ডলার, আর ডলার মানেই আমেরিকার আর্থিক প্রভাব। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা সেই কাঠামোকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা শুধু জ্বালানি সরবরাহ নয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা বা অবরোধের অর্থ শুধু পরিবহন ব্যাহত হওয়া নয়, বরং পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হওয়া। এশিয়ার দেশগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। কারণ দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তাদের শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।

এই বাস্তবতায় অনেক দেশ পুরোনো বাজারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে সরাসরি রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সমঝোতার পথে হাঁটছে। তেল কোম্পানি, আন্তর্জাতিক বাজার বা প্রচলিত ট্রেডিং ব্যবস্থার বদলে এখন সরকারগুলো নিজেই সরবরাহ নিশ্চিত করার কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে। এর ফলে জ্বালানি বাণিজ্য ধীরে ধীরে আরও রাজনৈতিক এবং কম স্বচ্ছ হয়ে উঠছে।

Hormuz shock puts Bangladesh's energy security at risk | The Business  Standard

বিশেষ করে এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো এখন বুঝতে পারছে যে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই তারা দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, কৌশলগত মজুত এবং দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার দিকে ঝুঁকছে। ভারত, চীন, জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর সাম্প্রতিক তৎপরতা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডলারের বিকল্প খোঁজার প্রবণতা। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য আমেরিকাকে বিশাল কূটনৈতিক শক্তি দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে শুরু করে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ—সব ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটনের ক্ষমতার বড় ভিত্তি ছিল এই “পেট্রোডলার” ব্যবস্থা।

কিন্তু যখন কোনো দেশ মনে করে ডলারনির্ভর কাঠামো তার জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে, তখন বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজার চাপ বাড়ে। রাশিয়া, ইরান কিংবা ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বহু রাষ্ট্রকে নতুন হিসাব করতে বাধ্য করেছে। এখন ধীরে ধীরে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, পণ্য বিনিময়ভিত্তিক চুক্তি কিংবা বিকল্প আর্থিক চ্যানেলের ব্যবহার বাড়ছে।

Oil Now Makes Our Dollar-Based Global Economy Inflammable - Fair Observer

যদিও বাস্তবে ডলারের অবস্থান এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নিকট ভবিষ্যতে অন্য কোনো মুদ্রা সেটিকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারবে না, তবুও বর্তমান পরিস্থিতি একটি ধীর কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য যদি ক্রমশ দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক চুক্তিনির্ভর হয়ে ওঠে, তাহলে একসময়ের একক বাজারব্যবস্থা আরও খণ্ডিত হয়ে পড়বে।

এর ফলও হবে বহুমাত্রিক। প্রথমত, তেলের দামের স্বচ্ছতা কমতে পারে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক সম্পর্ক জ্বালানি বাণিজ্যে আরও বড় ভূমিকা নেবে। তৃতীয়ত, বাজারের পরিবর্তে রাষ্ট্রনির্ভর দর-কষাকষি বাড়বে, যা দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

একই সঙ্গে আমেরিকার জন্যও এটি একটি সতর্কবার্তা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি উৎপাদক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু শুধু উৎপাদনশক্তি নয়, আর্থিক কাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণও ছিল তার বৈশ্বিক নেতৃত্বের অন্যতম ভিত্তি। যদি সেই কাঠামো ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করে, তাহলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎও আরও জটিল হয়ে উঠবে।

সবচেয়ে বড় কথা, বর্তমান সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে জ্বালানি এখন আর শুধু অর্থনৈতিক পণ্য নয়; এটি কৌশলগত অস্ত্র, কূটনৈতিক হাতিয়ার এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার অন্যতম নির্ধারক। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাত হয়তো একদিন থামবে, কিন্তু এর প্রভাব বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন থেকে যাবে।