০৭:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
রাশিয়ার রসদ সরবরাহে ড্রোনের আঘাত, যুদ্ধের নতুন মোড়ে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপ স্বপ্নে উড়ান, শক্তিশালী সূচনায় ফুটবল বিশ্বের নজর কাড়ল স্বাগতিকরা শত দিনের কাজের বদলে নতুন কর্মসংস্থান আইন, শ্রমিকদের আশঙ্কা বাড়ছে ভারতে ৮০ জনে একটি চাকরি: উত্তরপ্রদেশে কনস্টেবল পরীক্ষায় ২৮ লাখ তরুণের ভিড়, সামনে কর্মসংস্থানের কঠিন বাস্তবতা নজরহীন সমুদ্রতল, ঝুঁকিতে বিশ্বের ডিজিটাল ধমনি জোহরের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই: কয়েকটি আসনই ঠিক করতে পারে পরবর্তী সরকার মে মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৬২২ প্রাণহানি, সবচেয়ে ঝুঁকিতে মোটরসাইকেল এফবিসিসিআইর স্বাগত বাজেট, তবে রাজস্ব আদায় ও বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ ভারতের আসামে বিমানবাহিনীর এএন-৩২ বিধ্বস্ত, অবতরণের সময় আগুন লেবাননে আবারও ইসরায়েলি হামলা, নিহত ৫; যুদ্ধবিরতি নিয়েও বাড়ছে অনিশ্চয়তা

হাইলাইট: অদ্ভুত মামলা, নজিরবিহীন কারসাজি

কুড়িগ্রামের উলিপুর থানার বুড়াবুড়ি সাতভিটা এলাকার চাঁদ মিয়ার ছেলে আশিকুর রহমান (২৪) রাষ্ট্র্রের চোখে একজন ‘জুলাই শহীদ’। এ জন্য স্বীকৃতির পাশাপাশি অনুদানের ৩০ লাখ টাকাও বুঝিয়ে দেওয়া হয় পরিবারকে।

কিন্তু কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আন্দোলনের ধারেকাছেই ছিলেন না আশিকুর। মস্তিষ্কে সংক্রমণজনিত অসুস্থতার চিকিৎসায় পুরোটা সময় ছিলেন হাসপাতালের বিছানায়। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে ‘ব্রেন ইনফেকশন’ লেখা থাকলেও আশিকুরের ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ লেখা হয় ‘হেড ইনজুরি’।

কালের কণ্ঠের সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর আশিকুর রহমান মূলত মস্তিষ্কে সংক্রমণজনিত (পরিবারের সদস্যদের ভাষায় ব্রেন টিউমার) কারণেই মারা গেছেন।

এরপর তাঁর মৃত্যুর এক মাস ১০ দিন পর কুড়িগ্রাম সদর থানায় একটি হত্যা মামলা (নম্বর ১৩) করা হয়। মামলায় আসামির সংখ্যা ১০৪, যেখানে তিনজন সাংবাদিক। গত বছরের ১৫ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জুলাই শহীদদের নামের তালিকাসংবলিত গেজেট প্রকাশ করে। ওই গেজেটে ২১৭ নম্বরে আছে আশিকুরের নাম।

গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ সাংবাদিকতাকে বিক্ষত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে পরিকল্পিতভাবে অন্তত ৪৯টি মামলায় ২৮২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। মামলার নথিগুলো যাচাই করে দেখা গেছে, বেশির ভাগই অদ্ভুত এবং কারসাজিতে ভরা।

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সেই ছাড়পত্রে কোথাও উল্লেখ নেই, তিনি জুলাই আন্দোলনে মাথায় আঘাত বা সে কারণে কোনো ধরনের ট্রমা, ব্লান্ট ইনজুরিতে আহত ছিলেন। অর্থাৎ চিকিৎসার প্রথম আনুষ্ঠানিক নথিতে তাঁকে একজন সংক্রমণজনিত জটিলতায় আক্রান্ত রোগী হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে।

মৃত্যু নিবন্ধন কী | What is Death Certificate in BD?

ডেথ সার্টিফিকেটে যা বলা হয়েছে

আশিকুর রহমানের মৃত্যুসনদ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রোগের ঘরে লেখা হয়— ‘সেপটিক শক উইথ একেআই উইথ মেনিনগোএনসেফালাইটিস উইথ অ্যালেজড এইচ/ও হেড ইনজুরি ডিউরিং স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট’। অর্থাৎ এখানে নতুনভাবে যুক্ত হয়—সেপটিক শক (গুরুতর সংক্রমণের কারণে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হওয়ার মতো সংকটজনক অবস্থা), অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি (হঠাৎ কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া/কিডনি ফেইলিওরের অবস্থা), মেনিনগোএনসেফালাইটিস (মস্তিষ্ক ও মস্তিষ্কের আবরণে প্রদাহ/সংক্রমণ) এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘অ্যালেজড হিস্ট্রি অব হেড ইনজুরি ডিউরিং স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট’ অর্থাৎ ছাত্র আন্দোলনের সময় মাথায় আঘাত পাওয়ার অভিযোগ/ইতিহাস ছিল। এরপর মৃত্যুর কারণে লেখা হয়, ‘ইরিভার্সিবল কার্ডিওরেসপিরেটরি অ্যারেস্ট ডিউ টু অ্যাবাভ মেনশনড ডিজিজেস’। অর্থাৎ উপরোক্ত রোগগুলোর কারণে অপরিবর্তনীয় হৃদযন্ত্র ও শ্বাসযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মৃত্যু হয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, মৃত্যুসনদে কোনো তথ্য লেখার ক্ষেত্রে চিকিৎসা পর্যবেক্ষণই চূড়ান্ত হওয়া উচিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “মৃত্যুসনদে কোনোভাবেই ‘হেড ইনজুরি ডিউরিং স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট’ বা এ জাতীয় কিছু লেখার সুযোগ নেই। সেখানে এর আগে ‘অ্যালেজড’ শব্দ ব্যবহার করলেও এটি সরকারি নথির অংশ হয়ে যায়। পরে সেটি ভিন্নভাবে ব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।”

দুই দিন লুকোচুরির পর সেই

চিকিৎসকের দায় স্বীকা

রংপুর মেডিক্যালের চিকিৎসাপত্রে ‘ব্রেইন ইনফেকশন’ উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেথ সার্টিফিকেটে ‘হেড ইনজুরি কিভাবে এলো—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চায় কালের কণ্ঠ অনুসন্ধানী সেল।

গত রবিবার দুপুর ১টার দিকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। প্রথমে আমরা প্রশাসনিক শাখায় গিয়ে আশিকের মৃত্যুসনদটির অস্তিত্ব নিশ্চিত করি। এবার মুখোমুখি হতে চাই সেই চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মন্তোষ কুমার মণ্ডলের, যিনি আশিকের মৃত্যুসনদে সই দিয়েছিলেন। তিনি নিজ কক্ষে নেই। ফোন করলে জানান মিটিংয়ে আছেন।

Protest, movement teaches us to live with proud - Anandabazar

স্থানীয় সমন্বয়কদের ভাষ্যআশিক

আন্দোলনে ছিলেন না

জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক লোকমান হোসেন লিমন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আশিক আন্দোলনেই ছিল না। তার নাম গেজেটে এলে সবাই তাজ্জব হয়ে যাই। ওই আন্দোলনের সম্পূর্ণ সিসিটিভি ফুটেজ আছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে কোথাও আশিকের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে ওর ছোট ভাই আন্দোলনে ছিল, সিসিটিভি ফুটেজে তাকে দেখা গেছে।’

বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু, তবু জুলাই শহীদ!

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের খবরে সারা দেশের মতো লালমনিরহাটের পাটগ্রামেও বিজয় মিছিল বের করা হয়। সেই মিছিলে অংশ নেন আজিজুল ইসলাম। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মিছিল চলাকালে আকস্মিকভাবে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে তাঁর শরীরে পড়ে এবং তিনি ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনাটিকে আরো আলোচনায় নিয়ে আসে সরকারি গেজেট। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত জুলাই শহীদদের তালিকায় আজিজুল ইসলামের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।

স্বাস্থ্য উপদেষ্টা যথাযথভাবে কাজ করছেন না: সারজিস

সারজিস বললেন, ভুয়া হলে বাতিল করা উচিত

আন্দোলনে অংশ না নিয়েও জুলাই শহীদের স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়ে সারজিস বলেন, “লালমনিরহাট বা ঠাকুরগাঁওয়ের এ রকম দু-একটি ঘটনা আমার নজরে এসেছিল এবং আমি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলাম। এক হাজার শহীদের তালিকায় এ রকম দু-তিনটি ভুল থাকতে পারে, যা প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে বাদ দেওয়া উচিত। কিন্তু দু-একটি উদাহরণের জন্য পুরো তালিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ঠিক হবে না। কুড়িগ্রামের ক্ষেত্রেও ডেথ সার্টিফিকেট এবং ‘কজ অব ডেথ’ যাচাই করা দরকার। যদি সত্যিই এ রকম ভুল হয়ে থাকে, তবে তা ক্রসচেক করে বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।”

ঘটনা ঢাকায়, আসামি বগুড়ার সাংবাদিক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় গুলিতে প্রাণ হারান মো. আলী হুসেন (৪৪) নামের এক আন্দোলনকারী। ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার আদালতে মামলা হয়। আর সেই মামলায় আসামি করা হয় ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২১০ কিলোমিটার দূরে বগুড়ার ৫৫ জনকে। তাঁদের মধ্যে ৯ জন সাংবাদিক।

এ ধরনের অদ্ভুত মামলাকাণ্ডে ক্ষোভ ও বিস্ময় দেখা দিয়েছে সাংবাদিকদের মধ্যে। ঘটনার সঙ্গে দূরতম সম্পর্ক না থাকলেও ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে তাঁদের এসব মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে তাঁদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

তথ্য চাইতে গিয়ে নকলায় সাংবাদিক কারাগারে

এখনো কারাগারে যত সাংবাদিক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের কয়েকজন সুপরিচিত সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব গ্রেপ্তার হন। ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বিমানবন্দরে বিদেশ যাওয়ার সময় আটক করা হয় শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রুপাকে। একাত্তর টেলিভিশনের এই দুই সাবেক শীর্ষ সাংবাদিক দম্পতি দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে আছেন।

গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বললেন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাসুদ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া বা ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিরা যদি ভুলবশত এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকেন, তবে তা সংশোধনের উদ্যোগ আগে থেকেই নেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, শুধু প্রকৃত ব্যক্তিদেরই সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে এবং যাঁরা প্রকৃত যোদ্ধা বা শহীদ নন, তাঁদের এই সুবিধার আওতাভুক্ত করা হবে না।

সূত্রঃ কালের কন্ঠ

জনপ্রিয় সংবাদ

রাশিয়ার রসদ সরবরাহে ড্রোনের আঘাত, যুদ্ধের নতুন মোড়ে ইউক্রেন

হাইলাইট: অদ্ভুত মামলা, নজিরবিহীন কারসাজি

০২:৩৮:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

কুড়িগ্রামের উলিপুর থানার বুড়াবুড়ি সাতভিটা এলাকার চাঁদ মিয়ার ছেলে আশিকুর রহমান (২৪) রাষ্ট্র্রের চোখে একজন ‘জুলাই শহীদ’। এ জন্য স্বীকৃতির পাশাপাশি অনুদানের ৩০ লাখ টাকাও বুঝিয়ে দেওয়া হয় পরিবারকে।

কিন্তু কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আন্দোলনের ধারেকাছেই ছিলেন না আশিকুর। মস্তিষ্কে সংক্রমণজনিত অসুস্থতার চিকিৎসায় পুরোটা সময় ছিলেন হাসপাতালের বিছানায়। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে ‘ব্রেন ইনফেকশন’ লেখা থাকলেও আশিকুরের ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ লেখা হয় ‘হেড ইনজুরি’।

কালের কণ্ঠের সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর আশিকুর রহমান মূলত মস্তিষ্কে সংক্রমণজনিত (পরিবারের সদস্যদের ভাষায় ব্রেন টিউমার) কারণেই মারা গেছেন।

এরপর তাঁর মৃত্যুর এক মাস ১০ দিন পর কুড়িগ্রাম সদর থানায় একটি হত্যা মামলা (নম্বর ১৩) করা হয়। মামলায় আসামির সংখ্যা ১০৪, যেখানে তিনজন সাংবাদিক। গত বছরের ১৫ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জুলাই শহীদদের নামের তালিকাসংবলিত গেজেট প্রকাশ করে। ওই গেজেটে ২১৭ নম্বরে আছে আশিকুরের নাম।

গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ সাংবাদিকতাকে বিক্ষত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে পরিকল্পিতভাবে অন্তত ৪৯টি মামলায় ২৮২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। মামলার নথিগুলো যাচাই করে দেখা গেছে, বেশির ভাগই অদ্ভুত এবং কারসাজিতে ভরা।

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সেই ছাড়পত্রে কোথাও উল্লেখ নেই, তিনি জুলাই আন্দোলনে মাথায় আঘাত বা সে কারণে কোনো ধরনের ট্রমা, ব্লান্ট ইনজুরিতে আহত ছিলেন। অর্থাৎ চিকিৎসার প্রথম আনুষ্ঠানিক নথিতে তাঁকে একজন সংক্রমণজনিত জটিলতায় আক্রান্ত রোগী হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে।

মৃত্যু নিবন্ধন কী | What is Death Certificate in BD?

ডেথ সার্টিফিকেটে যা বলা হয়েছে

আশিকুর রহমানের মৃত্যুসনদ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রোগের ঘরে লেখা হয়— ‘সেপটিক শক উইথ একেআই উইথ মেনিনগোএনসেফালাইটিস উইথ অ্যালেজড এইচ/ও হেড ইনজুরি ডিউরিং স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট’। অর্থাৎ এখানে নতুনভাবে যুক্ত হয়—সেপটিক শক (গুরুতর সংক্রমণের কারণে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হওয়ার মতো সংকটজনক অবস্থা), অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি (হঠাৎ কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া/কিডনি ফেইলিওরের অবস্থা), মেনিনগোএনসেফালাইটিস (মস্তিষ্ক ও মস্তিষ্কের আবরণে প্রদাহ/সংক্রমণ) এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘অ্যালেজড হিস্ট্রি অব হেড ইনজুরি ডিউরিং স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট’ অর্থাৎ ছাত্র আন্দোলনের সময় মাথায় আঘাত পাওয়ার অভিযোগ/ইতিহাস ছিল। এরপর মৃত্যুর কারণে লেখা হয়, ‘ইরিভার্সিবল কার্ডিওরেসপিরেটরি অ্যারেস্ট ডিউ টু অ্যাবাভ মেনশনড ডিজিজেস’। অর্থাৎ উপরোক্ত রোগগুলোর কারণে অপরিবর্তনীয় হৃদযন্ত্র ও শ্বাসযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মৃত্যু হয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, মৃত্যুসনদে কোনো তথ্য লেখার ক্ষেত্রে চিকিৎসা পর্যবেক্ষণই চূড়ান্ত হওয়া উচিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “মৃত্যুসনদে কোনোভাবেই ‘হেড ইনজুরি ডিউরিং স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট’ বা এ জাতীয় কিছু লেখার সুযোগ নেই। সেখানে এর আগে ‘অ্যালেজড’ শব্দ ব্যবহার করলেও এটি সরকারি নথির অংশ হয়ে যায়। পরে সেটি ভিন্নভাবে ব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।”

দুই দিন লুকোচুরির পর সেই

চিকিৎসকের দায় স্বীকা

রংপুর মেডিক্যালের চিকিৎসাপত্রে ‘ব্রেইন ইনফেকশন’ উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেথ সার্টিফিকেটে ‘হেড ইনজুরি কিভাবে এলো—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চায় কালের কণ্ঠ অনুসন্ধানী সেল।

গত রবিবার দুপুর ১টার দিকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। প্রথমে আমরা প্রশাসনিক শাখায় গিয়ে আশিকের মৃত্যুসনদটির অস্তিত্ব নিশ্চিত করি। এবার মুখোমুখি হতে চাই সেই চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মন্তোষ কুমার মণ্ডলের, যিনি আশিকের মৃত্যুসনদে সই দিয়েছিলেন। তিনি নিজ কক্ষে নেই। ফোন করলে জানান মিটিংয়ে আছেন।

Protest, movement teaches us to live with proud - Anandabazar

স্থানীয় সমন্বয়কদের ভাষ্যআশিক

আন্দোলনে ছিলেন না

জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক লোকমান হোসেন লিমন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আশিক আন্দোলনেই ছিল না। তার নাম গেজেটে এলে সবাই তাজ্জব হয়ে যাই। ওই আন্দোলনের সম্পূর্ণ সিসিটিভি ফুটেজ আছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে কোথাও আশিকের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে ওর ছোট ভাই আন্দোলনে ছিল, সিসিটিভি ফুটেজে তাকে দেখা গেছে।’

বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু, তবু জুলাই শহীদ!

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের খবরে সারা দেশের মতো লালমনিরহাটের পাটগ্রামেও বিজয় মিছিল বের করা হয়। সেই মিছিলে অংশ নেন আজিজুল ইসলাম। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মিছিল চলাকালে আকস্মিকভাবে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে তাঁর শরীরে পড়ে এবং তিনি ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনাটিকে আরো আলোচনায় নিয়ে আসে সরকারি গেজেট। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত জুলাই শহীদদের তালিকায় আজিজুল ইসলামের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।

স্বাস্থ্য উপদেষ্টা যথাযথভাবে কাজ করছেন না: সারজিস

সারজিস বললেন, ভুয়া হলে বাতিল করা উচিত

আন্দোলনে অংশ না নিয়েও জুলাই শহীদের স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়ে সারজিস বলেন, “লালমনিরহাট বা ঠাকুরগাঁওয়ের এ রকম দু-একটি ঘটনা আমার নজরে এসেছিল এবং আমি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলাম। এক হাজার শহীদের তালিকায় এ রকম দু-তিনটি ভুল থাকতে পারে, যা প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে বাদ দেওয়া উচিত। কিন্তু দু-একটি উদাহরণের জন্য পুরো তালিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ঠিক হবে না। কুড়িগ্রামের ক্ষেত্রেও ডেথ সার্টিফিকেট এবং ‘কজ অব ডেথ’ যাচাই করা দরকার। যদি সত্যিই এ রকম ভুল হয়ে থাকে, তবে তা ক্রসচেক করে বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।”

ঘটনা ঢাকায়, আসামি বগুড়ার সাংবাদিক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় গুলিতে প্রাণ হারান মো. আলী হুসেন (৪৪) নামের এক আন্দোলনকারী। ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার আদালতে মামলা হয়। আর সেই মামলায় আসামি করা হয় ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২১০ কিলোমিটার দূরে বগুড়ার ৫৫ জনকে। তাঁদের মধ্যে ৯ জন সাংবাদিক।

এ ধরনের অদ্ভুত মামলাকাণ্ডে ক্ষোভ ও বিস্ময় দেখা দিয়েছে সাংবাদিকদের মধ্যে। ঘটনার সঙ্গে দূরতম সম্পর্ক না থাকলেও ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে তাঁদের এসব মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে তাঁদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

তথ্য চাইতে গিয়ে নকলায় সাংবাদিক কারাগারে

এখনো কারাগারে যত সাংবাদিক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের কয়েকজন সুপরিচিত সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব গ্রেপ্তার হন। ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বিমানবন্দরে বিদেশ যাওয়ার সময় আটক করা হয় শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রুপাকে। একাত্তর টেলিভিশনের এই দুই সাবেক শীর্ষ সাংবাদিক দম্পতি দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে আছেন।

গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বললেন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাসুদ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া বা ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিরা যদি ভুলবশত এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকেন, তবে তা সংশোধনের উদ্যোগ আগে থেকেই নেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, শুধু প্রকৃত ব্যক্তিদেরই সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে এবং যাঁরা প্রকৃত যোদ্ধা বা শহীদ নন, তাঁদের এই সুবিধার আওতাভুক্ত করা হবে না।

সূত্রঃ কালের কন্ঠ