দেশজুড়ে গত মে মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৬২২ জন নিহত এবং ১ হাজার ৬৫২ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ সেল এ চিত্র তুলে ধরেছে। সংগঠনটির মতে, অনেক দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ না হওয়ায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে মে মাসে মোট ৬৭৬টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৬৭১ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ৬৯৬ জন। এর মধ্যে রেলপথে ৪২টি দুর্ঘটনায় ৩৪ জন নিহত ও ২৯ জন আহত হন। নৌপথে ২১টি দুর্ঘটনায় ১৫ জনের মৃত্যু, ১৫ জন আহত এবং সাতজন নিখোঁজ হন।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ভয়াবহতা
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, মে মাসে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন ছিল মোটরসাইকেল। এ সময় ২২১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৩১ জন নিহত এবং ২১৯ জন আহত হয়েছেন। মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৬ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং মোট মৃত্যুর ৩৭ দশমিক ১৩ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মুখোমুখি সংঘর্ষ ছিল সবচেয়ে বেশি, যা মোট দুর্ঘটনার ৪২ দশমিক ০৮ শতাংশ। এছাড়া যানবাহনের চাপা দেওয়া বা ধাক্কা লাগার ঘটনা ছিল ৩২ দশমিক ৩০ শতাংশ। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ১৮ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং ট্রেন-যানবাহনের সংঘর্ষ ছিল শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ।
ঢাকায় সর্বাধিক দুর্ঘটনা
বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। মে মাসে এখানে ১৮০টি দুর্ঘটনায় ১৮৫ জন নিহত এবং ৫৫৮ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে, যেখানে ২৭টি দুর্ঘটনায় ৩৮ জনের মৃত্যু এবং ৬৭ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন ১৩৬ জন চালক, ১১০ জন পথচারী, ৭৩ জন শিক্ষার্থী, ৬৯ জন নারী, ৫৯ জন শিশু এবং ৪৯ জন পরিবহন শ্রমিক। এছাড়া শিক্ষক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, চিকিৎসক, মুক্তিযোদ্ধা ও আইনজীবীও নিহতদের তালিকায় রয়েছেন।
কোথায় বেশি ঘটছে দুর্ঘটনা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট দুর্ঘটনার ৪৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে। আঞ্চলিক মহাসড়কে ঘটেছে ৩০ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং ফিডার সড়কে ১৮ দশমিক ১০ শতাংশ দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনায় জড়িত ৯৭৫টি যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেলের অংশ ছিল ২৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এরপর ট্রাক, পিকআপ ও কাভার্ড ভ্যানের অংশ ২৩ দশমিক ১০ শতাংশ, বাস ১৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক ১২ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং ব্যক্তিগত গাড়ি, জিপ ও মাইক্রোবাস ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
দুর্ঘটনার কারণ ও সুপারিশ
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবাধ চলাচল, সড়কে প্রয়োজনীয় চিহ্ন ও আলোর অভাব, মিডিয়ান বিভাজক না থাকা, উল্টো পথে যান চলাচল, বেপরোয়া ও ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক।
সংগঠনটি আরও বলেছে, অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে নিম্নআয়ের অনেক যাত্রী বাস বা পণ্যবাহী যানবাহনের ছাদে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, আধুনিক জাতীয় বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং সংস্কার, নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
মে মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৬২২ প্রাণহানি; মোটরসাইকেল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যান হিসেবে উঠে এসেছে, বলছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















