কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্ফোরক বিকাশের যুগে আমরা সাধারণত ডেটা সেন্টার, চিপ নির্মাতা বা প্রযুক্তি জায়ান্টদের নিয়ে কথা বলি। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির প্রকৃত ভিত্তি কোথায়—সে প্রশ্ন খুব কমই ওঠে। বাস্তবতা হলো, আমাদের ডিজিটাল সভ্যতার বড় অংশ নির্ভর করছে সমুদ্রের তলদেশে বিছিয়ে থাকা অদৃশ্য তারের ওপর। এই অবকাঠামো এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু ইন্টারনেট ধীর হবে না; ব্যাংকিং, বাণিজ্য, সামরিক যোগাযোগ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বহু প্রক্রিয়া একসঙ্গে বিপর্যস্ত হতে পারে।
সম্প্রতি ইরানের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ ও এশিয়াকে সংযুক্ত করা সাবমেরিন কেবল নিয়ে যে ধরনের বক্তব্য এসেছে, তা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নযোগ্য নয়। কিন্তু এসব মন্তব্য একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে এনেছে: আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোর একটি একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যেও রয়েছে।
ডিজিটাল যুগের অদৃশ্য দুর্বলতা
বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি বিনিয়োগের বর্তমান প্রবাহের দিকে তাকালে মনে হতে পারে, ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা উন্নত সফটওয়্যার। কিন্তু এই প্রযুক্তিগুলোর কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন ডেটা আদান-প্রদানের ওপর। আর সেই কাজের মূল ভার বহন করছে সমুদ্রতলের ফাইবার-অপটিক কেবল নেটওয়ার্ক।
অনেকের ধারণা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বড় অংশ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বাস্তবে বৈশ্বিক ডেটা প্রবাহের বিশাল অংশ এখনো সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমেই চলাচল করে। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেবল রুটে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা বহু মহাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সুরক্ষা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। হাজার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ কেবল সমুদ্রতলে বিস্তৃত, যেখানে নিয়মিত নজরদারি কার্যত অসম্ভব।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
অনেকেই মনে করতে পারেন, এটি নতুন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বাস্তবে যোগাযোগ অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ইতিহাস দীর্ঘ।
টেলিগ্রাফ আবিষ্কারের পর উনিশ শতকে বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটে। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলো দূরবর্তী উপনিবেশ পরিচালনার জন্য সাবমেরিন যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। খুব দ্রুতই এসব কেবল বাণিজ্যিক সম্পদ নয়, কৌশলগত অস্ত্র হিসেবেও বিবেচিত হতে শুরু করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনালগ্নে ব্রিটেন জার্মানির আন্তর্জাতিক কেবল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এর ফলে জার্মানি বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয় এবং সেই সুযোগে তাদের বহু বার্তা প্রতিপক্ষের হাতে ধরা পড়ে। পরবর্তী সময়ে শীতল যুদ্ধেও যোগাযোগ অবকাঠামো গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে ছিল।
আজ প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু মৌলিক বাস্তবতা বদলায়নি। তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ কিংবা বাধাগ্রস্ত করার ক্ষমতা এখনো কৌশলগত শক্তির অন্যতম উৎস।
সংকীর্ণ পথ, বড় ঝুঁকি
বিশ্বজুড়ে শত শত সাবমেরিন কেবল থাকলেও সেগুলো সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। বরং বেশিরভাগ ডেটা নির্দিষ্ট কয়েকটি সামুদ্রিক করিডরের মধ্য দিয়ে চলাচল করে। এই কেন্দ্রীভূত কাঠামোই বড় দুর্বলতা তৈরি করেছে।
লাল সাগর, বাল্টিক অঞ্চল কিংবা তাইওয়ানের আশপাশের জলসীমা—সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সীমিত কিছু পথের ওপর নির্ভরশীল। কোনো সংঘাত, দুর্ঘটনা বা নাশকতা সেখানে একাধিক কেবলকে একযোগে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
অবশ্য সাবমেরিন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নতুন ঘটনা নয়। মাছ ধরার জাহাজ, নোঙর কিংবা প্রাকৃতিক কারণেও নিয়মিত ক্ষতি হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ঘটনার ধরন বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন করেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বারবার সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে কেবল বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা অনেকের কাছে নিছক দুর্ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না।
হাইব্রিড সংঘাতের নতুন রূপ
আধুনিক রাষ্ট্রগুলো এখন সরাসরি যুদ্ধের আগেই প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার নানা পদ্ধতি খুঁজছে। সাইবার আক্রমণ, অর্থনৈতিক চাপ এবং তথ্যযুদ্ধের পাশাপাশি যোগাযোগ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর সম্ভাবনাও ক্রমশ বাড়ছে।
একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, শেয়ারবাজার, সরকারি যোগাযোগ কিংবা সামরিক কমান্ড নেটওয়ার্ক যদি হঠাৎ বিঘ্নিত হয়, তবে তা প্রচলিত সামরিক হামলার সমতুল্য প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে সাবমেরিন কেবল এখন শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নয়; জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও তা কেন্দ্রীয় গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশেষ করে তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য কোনো আঞ্চলিক সংঘাতের আলোচনায় এই বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা সামরিক অবরোধের একটি কার্যকর উপাদান হয়ে উঠতে পারে।
সমাধান কি যথেষ্ট?
পশ্চিমা দেশগুলো এই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে শুরু করেছে। ন্যাটো নজরদারি কার্যক্রম বাড়াচ্ছে, ইউরোপ নতুন বিনিয়োগ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে এবং বিভিন্ন দেশ বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে।
তবে বাস্তবতা হলো, এখনো পর্যন্ত গৃহীত পদক্ষেপগুলো ঝুঁকির তুলনায় সীমিত। স্যাটেলাইটভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থা কিছু সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু তার সক্ষমতা ও গতি এখনো সমুদ্রতলের কেবল নেটওয়ার্কের সমকক্ষ নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো বেসরকারি খাত ও সরকারের মধ্যে সহযোগিতার ঘাটতি। কেবল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণ প্রযুক্তিগত তথ্য থাকলেও তারা প্রায়ই সেগুলো ভাগাভাগি করতে অনিচ্ছুক। নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের এই দ্বন্দ্ব সমাধান না হলে কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন হবে।
অদৃশ্য সংকটের মুখোমুখি
বিশ্ব রাজনীতিতে তেল, গ্যাস বা খনিজ সম্পদ নিয়ে আলোচনার অভাব নেই। অথচ ডিজিটাল যুগে তথ্য পরিবহনের অবকাঠামোও সমান গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হয়েছে। পার্থক্য শুধু এই যে, পাইপলাইন বা বন্দর চোখে দেখা যায়, কিন্তু সাবমেরিন কেবল অধিকাংশ মানুষের নজরের বাইরে থাকে।
এই অদৃশ্যতাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ কোনো বড় সংকট না ঘটলে আমরা বুঝতেই পারি না, আধুনিক অর্থনীতি ও সমাজের কতটা অংশ সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা এই নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে, তখন সেই ভবিষ্যতের ভিত্তি যে কতটা ভঙ্গুর, সাবমেরিন কেবল নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগ আমাদের সেই বাস্তবতার কথাই আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে।
জনাথন এয়াল 



















