দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তকে সাধারণত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ কিংবা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু সীমান্তের আরেকটি বাস্তবতা আছে, যা ইসলামাবাদের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় খুব কমই জায়গা পায়। এই সীমান্ত লাখো মানুষের জীবিকা, পারিবারিক সম্পর্ক, বাণিজ্যিক আস্থা এবং সামাজিক অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ফলে সীমান্ত বন্ধের সিদ্ধান্ত কেবল একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এটি পুরো একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়ার সমান।
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে পাকিস্তান আফগানিস্তানের সঙ্গে প্রধান পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তগুলো কার্যত বন্ধ রাখে। সরকারের যুক্তি ছিল, আফগান ভূখণ্ড থেকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের হামলা বেড়ে যাওয়ায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তার যুক্তি রাষ্ট্রের কাছে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে কি এমন এক নীতি গ্রহণ করা উচিত, যার বোঝা বহন করতে হচ্ছে মূলত সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষকে?
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার বাণিজ্যকে কেবল আমদানি-রপ্তানির পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা যায় না। এই অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে বহু পুরোনো সামাজিক সম্পর্ক, পারিবারিক সংযোগ, ভাষাগত মিল এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর। সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী বহু মানুষের আত্মীয়স্বজন, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং সাংস্কৃতিক শিকড় একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাষ্ট্রের আঁকা সীমারেখা তাদের দৈনন্দিন বাস্তবতাকে কখনো পুরোপুরি আলাদা করতে পারেনি।

এই অঞ্চলে বাণিজ্যের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে আস্থাভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে এসেছে। আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবসায়ীরা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করেই পণ্য সরবরাহ করেন। পেশোয়ার, খাইবার বা করাচির অনেক ব্যবসায়ীর জন্য কাবুল, জালালাবাদ কিংবা কান্দাহার শুধু বিদেশি শহর নয়; সেগুলো তাদের বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের অংশ। সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো এই বিশ্বাসভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর হঠাৎ ভেঙে পড়া।
সরকারি নীতিতে সীমান্তকে প্রায়ই “নিয়ন্ত্রণ”, “নজরদারি” এবং “নিরাপত্তা”র প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। কিন্তু সীমান্ত এলাকার মানুষের কাছে এটি রুজি-রোজগারেরও ক্ষেত্র। একটি ট্রাক শুধু একজন চালকের আয়ের উৎস নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে সহকারী, গুদাম শ্রমিক, লোডার, মেকানিক, টায়ার ব্যবসায়ী, কাস্টমস এজেন্ট, ছোট ব্যবসায়ী, এমনকি রাস্তার ধারের খাবারের দোকান পর্যন্ত। সীমান্ত দিয়ে ট্রাক চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে ক্ষতিটা কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো অর্থনৈতিক চক্রে তার অভিঘাত পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে লাভের পরিমাণও দ্রুত কমে আসে। অনেক ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে অভিযোগ করেছেন, তাদের আয় অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। অথচ এই ক্ষতির বড় অংশ বহন করছেন সেই মানুষরা, যারা বৈধ বাণিজ্যের মাধ্যমেই জীবিকা নির্বাহ করতেন। নিরাপত্তা নীতির উদ্দেশ্য যদি বৈধ কাঠামোকে শক্তিশালী করা হয়, তাহলে বারবার সীমান্ত বন্ধের মাধ্যমে ঠিক উল্টো ফলই তৈরি হচ্ছে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা বলছে, বৈধ বাণিজ্য যখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে, তখন অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ পথ সক্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ ব্যবসা কখনো পুরোপুরি থেমে থাকে না; এটি শুধু নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার বাইরে সরে যায়। ফলে কঠোর সীমান্তনীতি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণকে দুর্বলও করতে পারে। যে অর্থনৈতিক প্রবাহ সরকার বৈধ কাঠামোর মধ্যে রাখতে চায়, তা ক্রমে অনিয়ন্ত্রিত চ্যানেলে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের এখানে একটি মৌলিক বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। নিরাপত্তা ও বাণিজ্যকে একই দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালনা করা যায় না। সীমান্ত সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনীয়তা যেমন আছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সীমান্ত অর্থনীতিকে সচল রাখাও জরুরি। বারবার বন্ধের পরিবর্তে স্পষ্ট ও পূর্বানুমেয় নীতিমালা, উন্নত কাস্টমস ব্যবস্থা, কার্যকর পেমেন্ট অবকাঠামো এবং ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার বিকল্প নেই।
আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা প্রভাবিত। কিন্তু কেবল সামরিক বা গোয়েন্দা হিসাব দিয়ে এই সীমান্তকে বোঝা সম্ভব নয়। এখানে অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানুষের চলাচল সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তকে শুধু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের জায়গা হিসেবে না দেখে যদি আদান-প্রদান ও আন্তঃনির্ভরতার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তাহলে আরও কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থাপনা সম্ভব হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, সীমান্ত এলাকার জনগণকে নিরাপত্তানীতির নিছক ভুক্তভোগী হিসেবে দেখলে চলবে না। তারা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অংশীদার। তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সীমান্ত নিরাপত্তাও টেকসই হতে পারে না। রাষ্ট্র যদি বৈধ বাণিজ্যের পথকে অকার্যকর করে তোলে, তাহলে অনিয়ন্ত্রিত বিকল্পের বিস্তার ঠেকানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
নাভিদ আহমদ শিনওয়ারি 


















