সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং বার্লিন প্রাচীর ভেঙে পড়ার পর অনেকেই মনে করেছিলেন সমাজতন্ত্রের রাজনৈতিক আকর্ষণ শেষ হয়ে গেছে। ইতিহাস যেন পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছিল, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকে না। কিন্তু কয়েক দশক পর পশ্চিমা বিশ্বের রাজনীতিতে আবারও সমাজতান্ত্রিক ধারণার উত্থান দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। এই প্রবণতা কেবল একটি রাজনৈতিক পছন্দ নয়; এটি এক ধরনের মানসিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া, যা জন্ম নিচ্ছে অনিশ্চয়তা, বৈষম্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ের ভেতর থেকে।
আজকের তরুণদের বড় একটি অংশ মনে করে পুঁজিবাদ তাদের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারেনি। চাকরির অনিশ্চয়তা, বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষাঋণের চাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তাদের হতাশ করছে। সেই সঙ্গে জলবায়ু সংকট নিয়ে আতঙ্ক এবং ধনীদের বিপুল সম্পদ তাদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ তৈরি করেছে। ফলে “সবাইকে সমান সুযোগ” কিংবা “রাষ্ট্রের দায়িত্বে মৌলিক সেবা” ধরনের স্লোগান সহজেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধারণাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর?
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বড় শহরে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, অতিরিক্ত কর আর ব্যবসাবিরোধী নীতির প্রভাব শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিকেই দুর্বল করে। অনেক প্রগতিশীল রাজনীতিক মনে করেন ধনীরা যেখানেই থাকুক, বাড়তি কর মেনেই নেবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা এবং বড় কোম্পানিগুলো দ্রুত এমন জায়গায় চলে যাচ্ছে, যেখানে কর কম এবং নীতিগত পরিবেশ ব্যবসাবান্ধব। নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া কিংবা সিয়াটলের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বড় শহরগুলোর কর রাজস্বের বড় অংশ আসে অল্পসংখ্যক উচ্চ আয়ের মানুষের কাছ থেকে। যখন সেই মানুষ বা প্রতিষ্ঠান অন্যত্র চলে যায়, তখন সামাজিক কর্মসূচি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও কমে যায়। তখন সরকারকে হয় কর আরও বাড়াতে হয়, নয়তো রিজার্ভ তহবিলে হাত দিতে হয়। শেষ পর্যন্ত চাপ পড়ে সাধারণ নাগরিকের ওপর।
তরুণদের ক্ষোভকে পুরোপুরি অযৌক্তিক বলা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিদিন তাদের সামনে এমন এক জীবনযাত্রার ছবি তুলে ধরে, যা অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে। বিশ্ববিদ্যালয় শেষে অনেকে এমন ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন, যার বাজারমূল্য সীমিত। অথচ তাদের কাঁধে বিশাল ঋণের বোঝা। ফলে তারা এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে দোষারোপ করছে, যেটিকে তারা নিজেদের ব্যর্থতার কারণ বলে মনে করছে।
কিন্তু হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক আকর্ষণ সবসময় বাস্তবসম্মত হয় না। ইতিহাস বহুবার দেখিয়েছে, কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি স্বাধীনতা সংকুচিত করে এবং উৎপাদনশীলতাকে দুর্বল করে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বহু উদাহরণে সাধারণ মানুষের জীবনে সমতা আসেনি; বরং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক এলিটদের ক্ষমতা আরও বেড়েছে।
একই সঙ্গে সমাজে এক ধরনের সাংস্কৃতিক দ্বিচারিতাও তৈরি হয়েছে। ধনীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করা হচ্ছে, কিন্তু সেই একই মানুষ বিলাসবহুল ভোক্তা সংস্কৃতির অংশ হয়েও থাকতে চাইছে। করপোরেট শক্তির সমালোচনা করা হচ্ছে, আবার সেই করপোরেট পণ্য ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতাও বাড়ছে। এই বৈপরীত্য তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে।

শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতি, ইতিহাস কিংবা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গভীর বোঝাপড়া ছাড়া যখন রাজনৈতিক মতাদর্শ গড়ে ওঠে, তখন আবেগ বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়। বাজারব্যবস্থা কীভাবে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান তৈরি করে, সেই আলোচনাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। ফলে পুঁজিবাদের সীমাবদ্ধতা চোখে পড়লেও এর সাফল্যের দিকগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়।
অবশ্যই পুঁজিবাদ নিখুঁত কোনো ব্যবস্থা নয়। বৈষম্য, স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় কিংবা আবাসন সংকটের মতো সমস্যা বাস্তব এবং তা সমাধানের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সেই সমাধান যদি এমন এক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যায়, যেখানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ বাড়তেই থাকে, তাহলে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংযোগ—এসবের পেছনে মুক্তবাজার অর্থনীতির বড় ভূমিকা রয়েছে। এই ব্যবস্থা ত্রুটিমুক্ত নয়, কিন্তু এর বিকল্পগুলোর ব্যর্থতাও ইতিহাসে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছে।
তাই আজকের বিতর্ক কেবল সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিবাদ নয়। এটি আসলে বাস্তব অভিজ্ঞতা বনাম রাজনৈতিক আবেগের সংঘাত। তরুণদের উদ্বেগ বাস্তব, কিন্তু সেই উদ্বেগের সমাধান যদি ইতিহাসের কঠিন শিক্ষা ভুলে গিয়ে খোঁজা হয়, তাহলে ভবিষ্যতের সংকট আরও গভীর হতে পারে।
অ্যান্ডি কেসলার 


















