০২:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
হাইলাইট: অদ্ভুত মামলা, নজিরবিহীন কারসাজি কান পেরিয়ে ‘অম্মা আরিয়ান’-এর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সীমান্ত শুধু নিরাপত্তার রেখা নয়, বেঁচে থাকারও পথ হরমুজের ছায়ায় বদলে যাচ্ছে জ্বালানি রাজনীতির মানচিত্র পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, নাকি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক প্রজন্ম? মরক্কোর বিশ্বকাপ স্বপ্নে অস্থিরতা, আফ্রিকা সেরার মুকুট নিয়েও বাড়ছে অনিশ্চয়তা ব্রাজিলের ২৪ বছরের অপেক্ষা, নতুন কোচ আনচেলত্তির হাত ধরে বিশ্বকাপ স্বপ্নের নতুন যাত্রা পাখির মৃত্যুর রেকর্ড ভাঙছে সিঙ্গাপুরে, কাচঘেরা ভবনই বড় হুমকি মালয়েশিয়ার জোট রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা, আগাম নির্বাচনের ইঙ্গিত আনোয়ারের চীনের পিংলু খাল খুলছে সেপ্টেম্বরে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যে নতুন গতি

কান পেরিয়ে ‘অম্মা আরিয়ান’-এর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

চার দশক পেরিয়ে আবারও আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফিরে এসেছে জন আব্রাহামের ‘অম্মা আরিয়ান’। কান চলচ্চিত্র উৎসবে পুনরুদ্ধার করা সংস্করণে ছবিটির প্রদর্শনী নিছক নস্টালজিয়ার ঘটনা নয়; এটি ভারতীয় রাজনৈতিক সিনেমার এক মৌলিক ধারার পুনরাবিষ্কার। এমন এক সময়ে ছবিটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যখন সিনেমা ক্রমেই কর্পোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণে বন্দি, আর রাজনৈতিক শিল্পচর্চা প্রায় প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘অম্মা আরিয়ান’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং সিনেমাকে সামাজিক হস্তক্ষেপের মাধ্যম হিসেবে ভাবার এক বিরল উদাহরণ।

ছবিটির গুরুত্ব কেবল এর বিষয়বস্তুতে নয়, বরং এর নির্মাণ পদ্ধতিতেও নিহিত। আজকের ভাষায় যাকে “গণঅর্থায়ন” বলা হয়, তার বহু আগে জন আব্রাহাম ও তাঁর সহযাত্রীরা ‘ওডেসা’ নামের এক অনানুষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক সমষ্টি গড়ে তুলেছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শুধু একটি ছবি বানানো নয়; বরং বিকল্প চলচ্চিত্র সংস্কৃতির জন্য একটি গণভিত্তি তৈরি করা। সেই সময়ে আর্ট ফিল্মের দর্শক সীমিত ছিল, প্রদর্শনের জায়গাও ছিল অপ্রতুল। ওডেসা এই বিচ্ছিন্নতা ভাঙতে চেয়েছিল।

তারা শহর, মফস্বল, বিশ্ববিদ্যালয়, রাস্তার মোড়—যেখানে সম্ভব, সেখানে ভালো চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেছে। মানুষকে শুধু দর্শক হিসেবে নয়, অংশগ্রহণকারী হিসেবেও যুক্ত করেছে। এই প্রদর্শনী থেকেই সংগৃহীত অর্থে নির্মিত হয় ‘অম্মা আরিয়ান’। পরে ছবিটি আবার সেই মানুষদের কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, যারা এর পেছনে অর্থ ও শ্রম দিয়েছিল। আজকের ডিজিটাল যুগে “ওপেন সোর্স” ধারণা নিয়ে যত আলোচনা হয়, তার এক সাংস্কৃতিক রূপ যেন তখনই পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করেছিল ওডেসা।

Beyond Cannes, the enduring legacy of 'Amma Ariyan' | Hindustan Times

কিন্তু ছবিটির স্থায়ী শক্তি শুধু এর প্রযোজনা কাঠামোতে সীমাবদ্ধ নয়। এর ভেতরে রয়েছে রাজনৈতিক স্মৃতি, ব্যর্থ বিপ্লব, ব্যক্তিগত ক্ষত এবং সামাজিক দায়বোধের গভীর অনুসন্ধান। ছবির কেন্দ্রে আছে পুরুষন নামের এক যুবকের যাত্রা। এক অজ্ঞাত মৃতদেহকে ঘিরে শুরু হওয়া এই যাত্রা ধীরে ধীরে পরিণত হয় কেরালার রাজনৈতিক ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করার অভিজ্ঞতায়।

যুবকটির পরিচয় জানতে গিয়ে পুরুষন যাদের সঙ্গে দেখা করে, তারা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে অতীতের আন্দোলন, প্রতিরোধ বা বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কেউ ভগ্নস্বপ্নের প্রতিনিধি, কেউ সংগ্রামের অবশিষ্ট চিহ্ন। এইসব মুখ, স্থান ও স্মৃতির ভেতর দিয়ে চলচ্চিত্রটি এক কঠিন প্রশ্ন তোলে—র‍্যাডিক্যাল রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সমাজকে কী দেয়? আর ব্যক্তিমানুষের জীবনে তার মূল্য কতটা নির্মম হতে পারে?

জন আব্রাহাম এই প্রশ্নগুলোকে বিমূর্ত রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি “মা”-এর উপস্থিতিকে ছবির নৈতিক কেন্দ্র হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। একদিকে বিপ্লবের রোমান্টিক স্বপ্ন, অন্যদিকে সেই স্বপ্নের মানবিক মূল্য—এই সংঘাত ছবিটিকে গভীর আবেগ ও রাজনৈতিক তাৎপর্য দিয়েছে। পুরুষনের মায়ের উদ্দেশে পাঠানো বার্তাগুলো যেন কেবল ব্যক্তিগত সংবাদ নয়; বরং একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক আত্মসমালোচনা।

John Abraham's Amma Ariyan To Have Restored 4K World Premiere At Cannes  2026 | Filmfare.com

আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে ‘অম্মা আরিয়ান’ আরও প্রাসঙ্গিক মনে হয়। কারণ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন সমষ্টিগত রাজনৈতিক চর্চা দুর্বল হয়ে পড়েছে, অথচ সামাজিক ক্ষোভ ও বৈষম্য বাড়ছেই। ইন্টারনেট আমাদের যোগাযোগের নতুন পরিসর দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত “সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ” কীভাবে তৈরি হবে, সেই প্রশ্ন এখনও অনির্দিষ্ট। এই চলচ্চিত্র সেই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে আনে।

একইসঙ্গে এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ইতিহাস কখনও নিছক অতীত নয়। প্রতিরোধ, ব্যর্থতা, বিদ্রোহ—এসবের স্মৃতি সমাজের ভেতরে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। কখনও সতর্কবার্তা হিসেবে, কখনও অনুপ্রেরণা হিসেবে। ‘অম্মা আরিয়ান’ সেই স্মৃতিকে পুনরায় জাগিয়ে তোলে এবং দেখায়, রাজনৈতিক শিল্পের কাজ কেবল বিনোদন দেওয়া নয়; বরং সমাজকে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো।

কানে ছবিটির পুনরাগমন তাই শুধুই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ঘটনা নয়। এটি এমন এক চলচ্চিত্রচিন্তার প্রত্যাবর্তন, যা সিনেমাকে বাজারের পণ্য হিসেবে নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুশীলন হিসেবে দেখতে চায়। হয়তো এই পুনরাবিষ্কার নতুন প্রজন্মকে আবারও মনে করিয়ে দেবে—সিনেমা এখনও পরিবর্তনের ভাষা হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হাইলাইট: অদ্ভুত মামলা, নজিরবিহীন কারসাজি

কান পেরিয়ে ‘অম্মা আরিয়ান’-এর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

০২:১৪:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

চার দশক পেরিয়ে আবারও আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফিরে এসেছে জন আব্রাহামের ‘অম্মা আরিয়ান’। কান চলচ্চিত্র উৎসবে পুনরুদ্ধার করা সংস্করণে ছবিটির প্রদর্শনী নিছক নস্টালজিয়ার ঘটনা নয়; এটি ভারতীয় রাজনৈতিক সিনেমার এক মৌলিক ধারার পুনরাবিষ্কার। এমন এক সময়ে ছবিটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যখন সিনেমা ক্রমেই কর্পোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণে বন্দি, আর রাজনৈতিক শিল্পচর্চা প্রায় প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘অম্মা আরিয়ান’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং সিনেমাকে সামাজিক হস্তক্ষেপের মাধ্যম হিসেবে ভাবার এক বিরল উদাহরণ।

ছবিটির গুরুত্ব কেবল এর বিষয়বস্তুতে নয়, বরং এর নির্মাণ পদ্ধতিতেও নিহিত। আজকের ভাষায় যাকে “গণঅর্থায়ন” বলা হয়, তার বহু আগে জন আব্রাহাম ও তাঁর সহযাত্রীরা ‘ওডেসা’ নামের এক অনানুষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক সমষ্টি গড়ে তুলেছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শুধু একটি ছবি বানানো নয়; বরং বিকল্প চলচ্চিত্র সংস্কৃতির জন্য একটি গণভিত্তি তৈরি করা। সেই সময়ে আর্ট ফিল্মের দর্শক সীমিত ছিল, প্রদর্শনের জায়গাও ছিল অপ্রতুল। ওডেসা এই বিচ্ছিন্নতা ভাঙতে চেয়েছিল।

তারা শহর, মফস্বল, বিশ্ববিদ্যালয়, রাস্তার মোড়—যেখানে সম্ভব, সেখানে ভালো চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেছে। মানুষকে শুধু দর্শক হিসেবে নয়, অংশগ্রহণকারী হিসেবেও যুক্ত করেছে। এই প্রদর্শনী থেকেই সংগৃহীত অর্থে নির্মিত হয় ‘অম্মা আরিয়ান’। পরে ছবিটি আবার সেই মানুষদের কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, যারা এর পেছনে অর্থ ও শ্রম দিয়েছিল। আজকের ডিজিটাল যুগে “ওপেন সোর্স” ধারণা নিয়ে যত আলোচনা হয়, তার এক সাংস্কৃতিক রূপ যেন তখনই পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করেছিল ওডেসা।

Beyond Cannes, the enduring legacy of 'Amma Ariyan' | Hindustan Times

কিন্তু ছবিটির স্থায়ী শক্তি শুধু এর প্রযোজনা কাঠামোতে সীমাবদ্ধ নয়। এর ভেতরে রয়েছে রাজনৈতিক স্মৃতি, ব্যর্থ বিপ্লব, ব্যক্তিগত ক্ষত এবং সামাজিক দায়বোধের গভীর অনুসন্ধান। ছবির কেন্দ্রে আছে পুরুষন নামের এক যুবকের যাত্রা। এক অজ্ঞাত মৃতদেহকে ঘিরে শুরু হওয়া এই যাত্রা ধীরে ধীরে পরিণত হয় কেরালার রাজনৈতিক ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করার অভিজ্ঞতায়।

যুবকটির পরিচয় জানতে গিয়ে পুরুষন যাদের সঙ্গে দেখা করে, তারা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে অতীতের আন্দোলন, প্রতিরোধ বা বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কেউ ভগ্নস্বপ্নের প্রতিনিধি, কেউ সংগ্রামের অবশিষ্ট চিহ্ন। এইসব মুখ, স্থান ও স্মৃতির ভেতর দিয়ে চলচ্চিত্রটি এক কঠিন প্রশ্ন তোলে—র‍্যাডিক্যাল রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সমাজকে কী দেয়? আর ব্যক্তিমানুষের জীবনে তার মূল্য কতটা নির্মম হতে পারে?

জন আব্রাহাম এই প্রশ্নগুলোকে বিমূর্ত রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি “মা”-এর উপস্থিতিকে ছবির নৈতিক কেন্দ্র হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। একদিকে বিপ্লবের রোমান্টিক স্বপ্ন, অন্যদিকে সেই স্বপ্নের মানবিক মূল্য—এই সংঘাত ছবিটিকে গভীর আবেগ ও রাজনৈতিক তাৎপর্য দিয়েছে। পুরুষনের মায়ের উদ্দেশে পাঠানো বার্তাগুলো যেন কেবল ব্যক্তিগত সংবাদ নয়; বরং একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক আত্মসমালোচনা।

John Abraham's Amma Ariyan To Have Restored 4K World Premiere At Cannes  2026 | Filmfare.com

আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে ‘অম্মা আরিয়ান’ আরও প্রাসঙ্গিক মনে হয়। কারণ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন সমষ্টিগত রাজনৈতিক চর্চা দুর্বল হয়ে পড়েছে, অথচ সামাজিক ক্ষোভ ও বৈষম্য বাড়ছেই। ইন্টারনেট আমাদের যোগাযোগের নতুন পরিসর দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত “সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ” কীভাবে তৈরি হবে, সেই প্রশ্ন এখনও অনির্দিষ্ট। এই চলচ্চিত্র সেই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে আনে।

একইসঙ্গে এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ইতিহাস কখনও নিছক অতীত নয়। প্রতিরোধ, ব্যর্থতা, বিদ্রোহ—এসবের স্মৃতি সমাজের ভেতরে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। কখনও সতর্কবার্তা হিসেবে, কখনও অনুপ্রেরণা হিসেবে। ‘অম্মা আরিয়ান’ সেই স্মৃতিকে পুনরায় জাগিয়ে তোলে এবং দেখায়, রাজনৈতিক শিল্পের কাজ কেবল বিনোদন দেওয়া নয়; বরং সমাজকে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো।

কানে ছবিটির পুনরাগমন তাই শুধুই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ঘটনা নয়। এটি এমন এক চলচ্চিত্রচিন্তার প্রত্যাবর্তন, যা সিনেমাকে বাজারের পণ্য হিসেবে নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুশীলন হিসেবে দেখতে চায়। হয়তো এই পুনরাবিষ্কার নতুন প্রজন্মকে আবারও মনে করিয়ে দেবে—সিনেমা এখনও পরিবর্তনের ভাষা হতে পারে।