আফ্রিকার বতসোয়ানার ওকাভাঙ্গো ডেল্টার শান্ত পানিতে এক ভয়াবহ মুহূর্ত বদলে দিয়েছিল অ্যালেইন ব্র্যান্ডেলিয়ারের পুরো জীবন। কুমিরের আক্রমণে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার একমাত্র কার্যকর হাত। চিকিৎসকেরা হাত কেটে ফেলার পরামর্শ দিলেও জীবনযুদ্ধ থামাননি তিনি। বরং দীর্ঘ পুনর্বাসনের পর আবারও পানিতে ফিরে এসে এখন লড়ছেন সমুদ্রের প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে।
জন্ম থেকেই শারীরিক চ্যালেঞ্জ
বেলজিয়ামের এই ডুবুরি জন্ম থেকেই বাম হাতে শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তাই ডান হাতই ছিল তার একমাত্র পুরোপুরি কার্যকর হাত। ছোটবেলা থেকেই পানির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। ডাইভিং, দীর্ঘ দূরত্ব সাঁতার আর ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের মধ্যেই তিনি নিজের সীমা ভাঙার চেষ্টা করতেন।
কিন্তু ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরের সেই সকালে সবকিছু বদলে যায়। পানির নিচে হঠাৎ একটি কুমির তার ডান হাতে কামড় বসায়। সহযাত্রীর দ্রুত সহায়তায় প্রাণে বেঁচে গেলেও হাতটি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে দীর্ঘ চিকিৎসা, সংক্রমণ আর একাধিক অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাকে।
হাল না ছাড়া এক মানুষের গল্প
চিকিৎসকেরা যখন হাত কেটে ফেলার কথা বলেন, তখন অ্যালেইন তা মেনে নিতে চাননি। মৃত্যুঝুঁকি থাকলেও হাত বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। অবশেষে চিকিৎসকেরা তার হাত রক্ষায় চেষ্টা চালান এবং তিনি বেঁচে যান। তবে এরপর শুরু হয় আরও কঠিন লড়াই।
ঘটনার মাত্র ছয় মাস পরই তিনি আবার পানিতে নামেন। শুরুতে ফিজিওথেরাপিস্টের সহায়তায় ধীরে ধীরে সাঁতার অনুশীলন করেন। পরে নিজের সীমাবদ্ধতাকে জয় করে নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে শুরু করেন। ২০১৫ সালে তিনি জিব্রাল্টার প্রণালি পাড়ি দেন। এরপর আরও কয়েকটি দীর্ঘ সাঁতার অভিযানে অংশ নেন।

সমুদ্র রক্ষার নতুন মিশন
পানিতে ফেরার পর অ্যালেইন আরেকটি বিষয় তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। বিভিন্ন সমুদ্র উপকূল আর ডাইভিং এলাকায় গিয়ে তিনি দেখতে পান ভয়াবহ প্লাস্টিক দূষণ। যে জায়গাগুলো একসময় স্বর্গের মতো সুন্দর ছিল, সেখানে এখন ছড়িয়ে আছে প্লাস্টিক বর্জ্য। সামুদ্রিক প্রাণীর জীবনও হুমকির মুখে পড়ছে।
এরপর থেকেই তিনি সমুদ্র পরিষ্কারের কাজে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। একটি পরিবেশবাদী সংস্থার সহায়তায় তহবিল সংগ্রহ শুরু করেন। ২০২৫ সালে তিনি স্পেনের দুটি দ্বীপের মধ্যবর্তী প্রায় ২৩ কিলোমিটার পথ সাঁতরে পাড়ি দেন। এই উদ্যোগে সংগ্রহ হয় উল্লেখযোগ্য অর্থ, যা সমুদ্রে পৌঁছানোর আগেই লাখো প্লাস্টিক বোতল আটকে রাখতে সহায়তা করবে।
প্রেরণার নতুন নাম
অ্যালেইনের মতে, তার লড়াই শুধু নিজের জন্য নয়। তিনি চান শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুরাও বুঝুক যে ইচ্ছাশক্তি আর অধ্যবসায় থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। কুমিরের হামলার স্মৃতি, শারীরিক যন্ত্রণা আর সীমাবদ্ধতা নিয়েই এখন তিনি এগিয়ে চলেছেন নতুন এক লক্ষ্য নিয়ে—সমুদ্রকে বাঁচানোর লড়াই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















