ডোনাল্ড ট্রাম্প বহুদিন ধরেই নিজেকে এমন এক নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন, যিনি আমেরিকাকে “অন্তহীন যুদ্ধ” থেকে বের করে আনবেন। কিন্তু ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধ এড়ানোর প্রতিশ্রুতি আর যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার বাস্তবতা এক বিষয় নয়। বরং এই সংঘাত নতুন এক প্রশ্ন সামনে এনেছে—আমেরিকা কি সত্যিই যুদ্ধ থেকে বেরোতে জানে, নাকি কেবল যুদ্ধের নাম বদলায়?
ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই ওয়াশিংটনের আলোচনায় একটি শব্দ বারবার ফিরে এসেছে—“অফর্যাম্প”। যেন যুদ্ধ একটি মহাসড়ক, যেখানে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে পাশের কোনো রাস্তা ধরে নিরাপদে সরে যাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তব জগতে যুদ্ধের এমন কোনো সহজ প্রস্থানপথ নেই। কারণ যুদ্ধ শেষ হলেও তার প্রভাব শেষ হয় না। মানচিত্র বদলে যায়, জোট বদলে যায়, অর্থনীতি বদলে যায়, আর সবচেয়ে বড় কথা—ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যায়।
ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে ধারণা করেছিল, দ্রুত ও সীমিত আঘাতের মাধ্যমে ইরানকে চাপে ফেলা সম্ভব হবে। কিন্তু কয়েক মাসের সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, তেহরানকে সহজে ভাঙা যাবে না। বরং ইরান এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে সে নিজেকে কেবল টিকে থাকা শক্তি হিসেবেই নয়, বরং আঞ্চলিক ভারসাম্যের অপরিহার্য অংশ হিসেবেও তুলে ধরতে পারছে। হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত পথের ওপর তাদের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিকে এখনও জিম্মি করে রাখতে সক্ষম।
অন্যদিকে, এই সংঘাত আমেরিকার জন্যও কম ব্যয়বহুল হয়নি। অস্ত্রভান্ডারের ওপর চাপ বেড়েছে, সামরিক প্রস্তুতি ক্ষয় হয়েছে, এবং ড্রোননির্ভর যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা পরিষ্কার হয়েছে। অল্প খরচের প্রযুক্তি কীভাবে বড় শক্তিকেও বিপাকে ফেলতে পারে, ইরান যুদ্ধ তার স্পষ্ট উদাহরণ। যুদ্ধক্ষেত্রে এই পরিবর্তন ভবিষ্যতের সংঘাতকে আরও অনিশ্চিত ও ব্যয়বহুল করে তুলবে।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি রাশিয়া ও চীনের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা রাশিয়ার আয় বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে, চীন নিজেকে আরও স্থিতিশীল ও দায়িত্বশীল শক্তি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। এক সময় আমেরিকা বেইজিংকে “দায়িত্বশীল অংশীদার” হওয়ার পাঠ দিত। এখন উল্টো প্রশ্ন উঠছে—বিশ্বব্যবস্থায় প্রকৃত স্থিতিশীলতার দাবিদার কে?

ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গেও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক দুর্বল হয়েছে। ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান বহু পুরোনো আস্থার ভিত্তিকে নড়বড়ে করেছে। পশ্চিমা নেতৃত্বের যে ধারণা দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা বহন করত, সেটিও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। যুদ্ধ কেবল শত্রুপক্ষকে নয়, মিত্রতাকেও ক্ষয় করে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই যুদ্ধের লক্ষ্য কখনোই পরিষ্কারভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। প্রশাসনের ভেতরেই ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা ছিল। কেউ বলেছে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে হবে, কেউ বলেছে কেবল শক্তি প্রদর্শনই যথেষ্ট। আবার কেউ কেউ এমনও মত দিয়েছে যে ট্রাম্প চাইলে “জয় ঘোষণা” করে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু যুদ্ধ কি কেবল ঘোষণায় শেষ হয়?
ইতিহাস বলছে, আমেরিকান নেতৃত্ব বহুবার “সম্মানজনক শান্তি”, “দায়িত্বশীল প্রত্যাহার” কিংবা “এক্সিট স্ট্র্যাটেজি”র ভাষা ব্যবহার করেছে। ভিয়েতনাম থেকে আফগানিস্তান—প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা প্রায়ই যুদ্ধ শুরুর কারণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে লক্ষ্য ও কৌশলের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
একজন বিশ্লেষক বহু বছর আগে লিখেছিলেন, “এক্সিট স্ট্র্যাটেজি” ধারণাটিই বিভ্রান্তিকর। কারণ যুদ্ধ কোনো যান্ত্রিক প্রকল্প নয়, যেখানে কাজ শেষ হলেই দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে আসা যায়। এটি এমন এক সংঘর্ষ, যেখানে প্রতিপক্ষও আপনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আচরণ করে না। আপনি যদি বারবার বেরিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তবে প্রতিপক্ষ আরও বেশি সময় ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার উৎসাহ পায়।
ইরান ইস্যুতেও ঠিক সেটিই দেখা যাচ্ছে। সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, তত স্পষ্ট হচ্ছে যে দ্রুত সমাধানের আশা অবাস্তব ছিল। ট্রাম্প একসময় বলেছিলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সব শেষ হবে। এখন সেই যুদ্ধ বহু মাস ধরে চলছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণাও টেকসই হচ্ছে না। ইরানের দাবিগুলোও ক্রমশ কঠোর হচ্ছে।
এখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, সংঘাতকে ছোট করে দেখানোর প্রবণতা। কখনো এটিকে “ছোটখাটো যুদ্ধ”, কখনো “সামান্য ঝামেলা” বলে বর্ণনা করা হচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধ কখনোই সামান্য নয়। যুদ্ধের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অভিঘাত বহু বছর ধরে টিকে থাকে।
ট্রাম্প “ফরএভার ওয়ার” শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ইরান সংঘাত দেখাচ্ছে, কোনো সুস্পষ্ট লক্ষ্য ছাড়া শুরু হওয়া যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত “হোয়াটএভার ওয়ার”-এ পরিণত হতে পারে—যে যুদ্ধের উদ্দেশ্য অস্পষ্ট, সমাপ্তি অনিশ্চিত, আর ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী।
যুদ্ধের বাস্তবতা হলো, সেখানে খুব কম পথই স্পষ্টভাবে চিহ্নিত থাকে। আর যেসব “অফর্যাম্প” দূর থেকে সহজ মনে হয়, বাস্তবে সেগুলো প্রায়ই ভাঙা, বিপজ্জনক এবং অজানা গন্তব্যের দিকে নিয়ে যায়।
কার্লোস লোজাদা 



















