মুনতাসীর মামুন আমার সরাসরি শিক্ষক নন। তবে তাঁর বেশ কয়েকজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা তারও আগে থেকেই মুক্তিযুদ্ধের বইপত্র পড়ার দরুণ তাঁর লেখার সাথে পরিচিতি ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা করেন অথচ মুনতাসীর মামুনের লেখা পড়েন নি, এমনটি হওয়া প্রায়ই অসম্ভব। মুক্তিযুদ্ধের বাইরে তিনি আরও অনেক বিষয়ে লিখেছেন। ঠিক কত বিষয়ে তিনি লিখেছেন তাঁর সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠজনদের কাছে এক প্রকার রহস্যময় ছিল। সম্প্রতি এ রহস্যের অবসান ঘটিয়েছেন বাংলাদেশের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মুর্শিদা বিনতে রহমান। ‘মুনতাসীর মামুন গ্রন্থপঞ্জি’ নামে অধ্যাপক মুর্শিদা বিনতে রহমানের গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে। তিনি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের অধীনে পিএইচডি অর্জন করেছেন। যদিও তিনি এখন স্বমহিমায় উজ্জ্বল। আগামী ২৪ মে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের ৭৫তম জন্মদিন। তিনি তাঁর শিক্ষক এর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছেন। এ বইটি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ চর্চা ও অনন্যা। আর মননশীল প্রচ্ছদ কারিগর ধ্রুব এষ। গ্রন্থটির মুদ্রিত মূল্য ৬৫০ টাকা। গ্রন্থটি মূলত প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের সাহিত্য, গবেষণা ও বৌদ্ধিক কর্মকাণ্ডের এক বিস্তৃত মূল্যায়নমূলক উপস্থাপন। এটি কেবল একটি জীবনী বা কাজের তালিকা নয়; বরং একজন লেখকের বৌদ্ধিক পরিচয় নির্মাণের একটি সামগ্রিক প্রয়াস, যেখানে ইতিহাস, রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সমাজচিন্তা একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। রচনাটির কেন্দ্রীয় শক্তি হলো এর বিশাল পরিসর ও বিষয়বৈচিত্র্য। মুনতাসীর মামুন শুধু অধ্যাপনা ও গবেষণাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; তিনি যুক্ত হয়েছেন বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞের সঙ্গে। তাঁর জন্মদিনের আগে তাঁর রচনা ও সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে চার শতাধিক গ্রন্থ। অধ্যাপক মুর্শিদা বিনতে রহমান এ চারশত গ্রন্থগুলোর মধ্যে তিনি সরাসরি সম্পাদনা ও লিখেছেন এমন গ্রন্থই অন্তর্ভূক্ত করেছেন। এছাড়া আরেকটি অধ্যায়ে সমগ্র নামে অন্তর্ভুক্ত করেছেন যেখানে মুক্তিযুদ্ধ কোষের পাঁচটি খন্ড, মুক্তিযুদ্ধ সমগ্রের চারটি খণ্ড, রাজাকার সমগ্র, ঢাকার স্মৃতি সমগ্র, ঢাকা সমগ্রের সাতটি খণ্ড, ইতিহাসের খেরোখোতা সমগ্র, কিশোর সমগ্রের সাতটি খণ্ড, ১০ খণ্ডে মুনতাসীর মামুন রচনাবলী, বঙ্গবন্ধু সমগ্র সন্নিবেশিত হয়েছে। এ সমগ্র সমূহ যোগ করলে তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। পূর্ববঙ্গের ইতিহাস, সমাজ, সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র, উৎসব, সমাজ-সংস্কৃতির নানা দিক, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, রাজনীতি, সিভিল সমাজ, বৈদেশিক নীতি, ভ্রমণকাহিনি এবং কিশোর সাহিত্যসহ বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় বিষয়ে তিনি লিখেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবেও তিনি সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করেছেন। ইতিহাসচর্চাকে তিনি কেবল তাত্ত্বিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তা প্রয়োগিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত করেছেন। বাংলা ভাষায় তাঁর নিরলস চর্চা ইতিহাসকে সাধারণ পাঠকের কাছে আরও জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গের সমাজ গ্রন্থটি পূর্ববঙ্গের ওপর লেখা তাঁর অন্যতম গ্রন্থ। সামগ্রিকভাবে পূর্ববঙ্গের ইতিহাস নিয়ে এটিই প্রথম গ্রন্থ। এই গ্রন্থের সূত্র ধরে মুনতাসীর মামুন পরবর্তী তিন দশক পূর্ববঙ্গের সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে ৪৮টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এটা বলাই যায়, পূর্ববঙ্গ নিয়ে একক গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃত এবং এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে নতুন কেউ নতুন গ্রন্থ রচনা করেন নি। তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন ঢাকা গবেষণাকে। ঢাকার সামাজিক ইতিহাস, মুদ্রণ সংস্কৃতি এবং নগর-অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি কাজকে পূর্ববঙ্গ ইতিহাসচর্চার একক ও অনন্য অবদান হিসেবে দেখানো হয়েছে। ঢাকা নিয়ে তার সর্বশেষ কাজ ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী দুই খণ্ডে ১৩০০ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ গবেষণায় তিনি একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছেন। শুধু বীরত্বগাথা নয়, তিনি গণহত্যা, যুদ্ধের নৃশংসতা, রাজাকার-আলবদরদের মানসিকতা, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং দলিলভিত্তিক ইতিহাস—সবকিছু মিলিয়ে একটি আর্কাইভাল ও বিশ্লেষণধর্মী কাঠামো তৈরি করেছেন। তিনি প্রায় ২৩৪ টি বইয়ের সম্পাদনার সাথে সরাসরি জড়িত। এসব কাজের উদ্যোক্তাও তিনি।

এর মধ্যে “মুক্তিযুদ্ধ কোষ [১২ খণ্ড]” ও “গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ [৩১]” ধরনের বৃহৎ সংকলন এই ধারার উদাহরণ। গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ ৩১ খণ্ডের মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮১৩৫। এছাড়া তাঁরই সম্পাদনায় ‘গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘন্ট গ্রন্থমালা’ থেকে ১২৮টি গণহত্যা নিয়ে ১১৯ টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আর ‘গণহত্যা-বধ্যভূাম জরিপ গ্রন্থমালা’ থেকে ৪০টি জেলার ওপর ৪০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি ‘মুক্তিযুদ্ধের শহিদের তালিকা’ সিরিজের কাজ শুরু করেছেন। এছাড়া সম্পাদনা করেছেন – ঢাকা গ্রন্থমালা (১৪টি গ্রন্থ), ইতিহাস ঐতিহ্য গ্রন্থমালা (৭টি গ্রন্থ), ‘বাংলাদেশ চর্চা’, ‘জন-ইতিহাস গ্রন্থমালা’ (১১টি গ্রন্থ), ‘শহিদ মুক্তিযোদ্ধা জীবনী’ (৩টি গ্রন্থ), দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থমালা (৫টি গ্রন্থ),– এর মত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এছাড়া মুনতাসীর মামুনের ৭০তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে তাঁর জীবন ও কর্মের ওপর ১৩ টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি শিশু-কিশোর সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। “দ্বীপ-দ্বীপান্তর”, “জয় বাংলা” ইত্যাদি উপন্যাস এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প-কোষ শিশুদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ভ্রমণ কাহিনী লিখেছেন ৬টি। সামগ্রিকভাবে, এই লেখাটি তাঁকে একজন আর্কাইভভিত্তিক ইতিহাসচর্চাকারী হিসেবে উপস্থাপন করে, যিনি ইতিহাসকে শুধু অতীতের বিবরণ নয়, বরং বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বোঝাপড়ার একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন। তিনি ৫টি জাদুঘর প্রতিষ্টার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর; তাঁরই প্রয়াসের ফল। অধ্যাপক মুর্শিদা বিনতে রহমানের গ্রন্থটিতে মুনতাসীর মামুনের গবেষণাকে ১৬ ভাগে ভাগ করেছেন। এতেই মুনতাসীর মামুনের লেখার বৈচিত্র ফুটে উঠেছে। এ গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর তথ্যসমৃদ্ধ ও সুশৃঙ্খল বিন্যাস। বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক রচনার তালিকা পাঠকদের জন্য সহজবোধ্যভাবে সাজানো হয়েছে, যা গবেষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠকদের জন্য সমানভাবে উপযোগী। বিশেষত যারা বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করেন কিংবা বাংলা ভাষায় গবেষণাধর্মী রচনার ধারাবাহিকতা জানতে আগ্রহী, তাঁদের জন্য এই বইটি কার্যকর সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। সব মিলিয়ে, “মুনতাসীর মামুন গ্রন্থপঞ্জি” একটি মূল্যবান তথ্যভান্ডার, যা ভবিষ্যৎ গবেষণা ও ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি শুধু একজন লেখকের রচনাসম্ভারের তালিকা নয়, বরং তাঁর বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণের একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রয়াস। বাংলাদেশের এমন লেখক সম্ভবত আর নেই যাকে ১০৭টি বই উৎসর্গ করা হয়েছে। এ তালিকায় প্রয়াত আবদুল গাফফার চৌধুরী, হুমায়ূন আহমেদ, আলী ইমাম থেকে শুরু করে অনেক নবীন লেখক রয়েছেন। সমকালে একাডেমিশিয়ান, পদাধিকারবলে বুদ্ধিজীবী, স্টাবলিশমেন্ট তাকে নিয়ে সমালোচনা করে। বামপন্থী বলে পরিচিত চরম ডানপন্থী লোকেরা তাঁকে কটুক্তি করে। তবে সব কিছু ছাপিয়ে তিনি সাধারণের কাছে বেঁচে আছেন তাঁর কর্মের গুণে। অধ্যাপক মুর্শিদা বিনতে রহমানের এ গ্রন্থটি সাংবাদিক, সাহিত্যিক, গবেষক কিংবা শিক্ষার্থী – সকলের সংগ্রহ করা উচিত। কারণ পূর্ববঙ্গ, ঢাকা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেকোনো বিষয়ে লিখতে হলে তাঁর গ্রন্থের স্মরণাপন্ন হতে হবে।
রিয়াদ হোসেন 



















