শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকায় মানুষ ও বন্য হাতির সংঘাত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। খাদ্যের সন্ধানে বন্য হাতির পাল নিয়মিতভাবে লোকালয়ে ঢুকে ফসলি জমি ও বসতবাড়িতে হামলা চালাচ্ছে। এতে সীমান্ত এলাকার কৃষক ও বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে দিন দিন।
বিশেষ করে আমন ও বোরো ধান পাকানোর মৌসুমে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে কাঁঠাল ও কলা পাকার সময়ও হাতির উপদ্রব বেড়ে যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে হাতির দল গ্রামে নেমে এসে ধানক্ষেত, কলাবাগান ও কাঁঠালের বাগান তছনছ করে ফেলে।
সংকটের পেছনের কারণ
বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, বন উজাড়, পাহাড়ে খাদ্যের সংকট এবং হাতির চলাচলের স্বাভাবিক করিডর নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এ সংঘাত তীব্র হয়েছে। আগে যেসব পথে হাতিরা অবাধে চলাচল করত, এখন সেখানে বসতি, কৃষিজমি ও বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। ফলে হাতির দল বাধ্য হয়ে লোকালয়ের দিকে চলে আসছে।
নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দিনে হাতির পাল বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের গভীর জঙ্গলে অবস্থান করলেও রাত নামলেই তারা দলবদ্ধভাবে গ্রামে ঢুকে পড়ে।
স্থানীয়দের আতঙ্ক ও প্রতিরোধ
হাতি তাড়াতে স্থানীয়রা টর্চলাইট, টিনের কৌটা ও পটকা ব্যবহার করছেন। তবে অনেক সময় হাতিরা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই ফসল ও ঘরবাড়ির বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এ সমস্যা চললেও স্থায়ী সমাধান এখনও মেলেনি। কৃষকেরা একদিকে ফসলহানির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে জীবন ঝুঁকির মধ্যেও রাত জেগে পাহারা দিতে হচ্ছে।

মানুষ ও হাতির প্রাণহানি
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে শেরপুর অঞ্চলে হাতির আক্রমণে অন্তত ৩৫ জন নিহত এবং ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। একই সময়ে প্রতিশোধমূলক হামলা, বৈদ্যুতিক ফাঁদ ও ফাঁদ পেতে শিকার করার কারণে কয়েকটি হাতিরও মৃত্যু হয়েছে।
ময়মনসিংহ বন বিভাগের আওতাধীন শেরপুর, জামালপুর ও নেত্রকোনা এলাকায় গত নয় বছরে অন্তত ৩২টি বন্য হাতির মৃত্যু হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবৈধ বৈদ্যুতিক ফাঁদ ও গুলিতে এসব হাতির মৃত্যু ঘটে।
বাড়ছে হাতির সংখ্যা
বন কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গারো পাহাড় এলাকায় হাতির সংখ্যা বেড়েছে। আগে যেখানে ১০০ থেকে ১২০টি হাতি দেখা যেত, বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় ১৭০ থেকে ১৮০-এ পৌঁছেছে। প্রাকৃতিক প্রজননের কারণে গত কয়েক বছরে অন্তত ৫০টি হাতিশাবকের জন্ম হয়েছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং হাতির চলাচলের করিডর পুনরুদ্ধার না করা গেলে এ সংকট কমবে না। তাদের মতে, মানুষ ও বন্য প্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি।
শেরপুর সীমান্তে মানুষ-হাতির সংঘাত
শেরপুর সীমান্তের গারো পাহাড় এলাকায় খাদ্যের সংকটে লোকালয়ে নেমে আসছে বন্য হাতির পাল। বাড়ছে ফসলহানি ও প্রাণহানির ঘটনা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















