বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক সংকটের প্রভাব মূল্যায়ন করতে গেলে তাৎক্ষণিক বাজার প্রতিক্রিয়ার বাইরে তাকাতে হয়। কারণ ইতিহাস দেখায়, সব সংকটের প্রভাব সমান নয়। কিছু ঘটনা সাময়িক অস্থিরতা সৃষ্টি করে, আবার কিছু ঘটনা দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আচরণ, সরকারি নীতি এবং শিল্প কাঠামো বদলে দেয়। ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটও সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে: এটি কি কেবল আরেকটি মূল্য-ধাক্কা, নাকি জ্বালানি বিশ্বের নতুন যুগের সূচনা?
গত কয়েক মাসে হরমুজ প্রণালির কার্যত অচলাবস্থার কারণে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে পৌঁছাতে পারেনি। একই সঙ্গে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের এলএনজি সরবরাহও আটকে পড়ে। তবু বাজার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি। মজুত তেল ব্যবহার, বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা এবং চীনের আমদানি কমে যাওয়ার মতো কারণগুলো পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করেছে।
এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজ আবার খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাজারে স্বস্তি ফিরছে। জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে আটকে থাকা তেল ও গ্যাস দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে। এতে স্বল্পমেয়াদে দাম কমার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, সংকট শেষ হলেও এর স্মৃতি কত দিন টিকে থাকবে?

ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ আছে যেখানে একটি ঘটনা পুরো শিল্পখাতের গতিপথ বদলে দিয়েছে। ডিজেলচালিত গাড়ির বাজার একসময় ইউরোপে আধিপত্য বিস্তার করলেও নির্গমন কেলেঙ্কারির পর ধীরে ধীরে তা জনপ্রিয়তা হারায়। বিপরীতে, কিছু বড় সংঘাতের পর বাজার দ্রুত মানিয়ে নিয়েছে এবং কয়েক বছরের মধ্যেই আগের অবস্থায় ফিরে গেছে।
ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও ফলাফল নির্ভর করবে মানুষ ও সরকারের প্রতিক্রিয়ার ওপর। যখন ভোক্তারা দেখেন যে আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম রাতারাতি বেড়ে যেতে পারে, তখন তারা বিকল্প খুঁজতে শুরু করেন। বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির প্রতি আগ্রহ বাড়ার পেছনে শুধু পরিবেশগত উদ্বেগ নয়, জ্বালানি নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিশেষ করে এশিয়ায় এই পরিবর্তনের সম্ভাবনা বেশি। অঞ্চলটি বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল জ্বালানি বাজার। এখানকার দেশগুলো একদিকে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ঝুঁকি মোকাবিলা করতে চায়, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে রয়েছে। ফলে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং বিদ্যুতায়নের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়তে পারে।
এলএনজির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠছে। অনেক দেশ এখন ভাবতে পারে, বিদেশ থেকে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কি সত্যিই নিরাপদ? যদি একটি সংকীর্ণ সমুদ্রপথে সংঘাতের কারণে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তাহলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত নবায়নযোগ্য শক্তি কি আরও নির্ভরযোগ্য বিকল্প নয়? এই চিন্তাধারা আগামী বছরগুলোতে জ্বালানি বিনিয়োগের দিক পরিবর্তন করতে পারে।

তবে আরেকটি সম্ভাবনাও রয়েছে। কয়লার যুগ যে শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, বর্তমান সংকট সেই ধারণাকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ করতে পারে। যেসব দেশের নিজস্ব কয়লা মজুত বিপুল, তারা জ্বালানি নিরাপত্তার যুক্তিতে কয়লার ব্যবহার দীর্ঘায়িত করতে পারে। পরিবেশগত লক্ষ্য পূরণ কঠিন হলেও সরবরাহ নিশ্চয়তার প্রশ্নে কয়লা অনেক সরকারের কাছে আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
অবশ্য জীবাশ্ম জ্বালানির পতনকে নিশ্চিত ধরে নেওয়া ভুল হবে। তেল ও গ্যাস উৎপাদক দেশগুলোও জানে যে বাজার ধরে রাখতে হলে মূল্যকে প্রতিযোগিতামূলক রাখতে হবে। যদি হরমুজ পুনরায় স্বাভাবিক হয়, সরবরাহ দ্রুত বাড়ে এবং তেল-গ্যাসের দাম দীর্ঘ সময় কম থাকে, তাহলে ভোক্তা ও সরকার উভয়েই সাম্প্রতিক সংকটকে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু সাময়িক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
বাস্তবে জ্বালানি ব্যবস্থার বড় পরিবর্তন সাধারণত একক কোনো ঘটনার ফলে ঘটে না। বরং সংকট, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত একসঙ্গে কাজ করে। ইরান যুদ্ধ সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে, কিন্তু তার ফল কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী কয়েক বছরের ওপর।
এই কারণেই বর্তমান সংকটকে কেবল তেলের দাম বাড়া বা কমার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যথেষ্ট নয়। আসল বিষয় হলো, এটি বিশ্বকে জ্বালানি নিরাপত্তা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে কি না। যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে ইরান যুদ্ধকে ভবিষ্যতে শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবে নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবেও স্মরণ করা হতে পারে।
ক্লাইড রাসেল 



















