রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। একই দিনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোটও তাদের প্রার্থী এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। ফলে ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবার একক প্রার্থীর আনুষ্ঠানিকতার বদলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে রূপ নেওয়ার পথে।
বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
মনোনয়নপত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রার্থিতা প্রস্তাব করেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান এবং হুইপ মিয়া নূরউদ্দিন আহমেদ অপু। তাঁর প্রার্থিতার সমর্থন করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় বিএনপির প্রতিনিধি দলে ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মণি, যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী অ্যানী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং আবদুস সালাম আজাদ।
দলের সিদ্ধান্তের পর রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়।
দলের মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পর বিএনপির মহাসচিব এবং দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপির রাজনীতিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।
একই দিনে অলি আহমেদের মনোনয়ন
মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন জমা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই রাষ্ট্রপতি পদে অলি আহমেদের মনোনয়নপত্র জমা দেয় জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোট।
বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ৪৯ মিনিটে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদের নেতৃত্বে জোটের একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন ভবনে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
এর আগে ১১ দলীয় জোট এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদকে তাদের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে। একই দিনে দুই রাজনৈতিক জোটের প্রার্থীর মনোনয়ন জমা দেওয়ার ঘটনায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আগ্রহ আরও বেড়েছে।

২০ আগস্ট ভোট, ভোট দেবেন ৩৪৯ সংসদ সদস্য
গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট।
সব প্রক্রিয়া শেষে ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে সংসদ সদস্যদের। বর্তমানে একটি সংসদীয় আসন শূন্য থাকায় মোট ভোটার সংখ্যা ৩৪৯ জন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটে জনগণ সরাসরি ভোট দেন না। সংসদ সদস্যরাই ভোট দিয়ে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। তাই এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের পাশাপাশি সংসদের রাজনৈতিক সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।
অর্থাৎ প্রায় ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোটের মাঠে একাধিক প্রার্থী থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর আগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সাধারণত একজন প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন পড়েনি। এবার একাধিক প্রার্থী থাকায় সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে ফল নির্ধারণ হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর নির্বাচন
গত ২৪ জুলাই মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের ২ অনুযায়ী, পদত্যাগের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সেই শূন্য পদ পূরণের জন্য ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। সেই সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যেই নির্বাচন আয়োজন করছে নির্বাচন কমিশন।
এখন মূল অপেক্ষা ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার। এরপর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হলে ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কোন রাজনৈতিক সমীকরণে যাচ্ছে, তা আরও স্পষ্ট হবে।
দুই প্রার্থীর মনোনয়ন জমার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা পেয়েছে। এখন নজর সংসদ সদস্যদের ভোট এবং শেষ পর্যন্ত দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে কে নির্বাচিত হন, সেদিকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















