০৬:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
মোদির পাকিস্তান নীতি: সংলাপহীনতার আড়ালে কি আঞ্চলিক আধিপত্যের রাজনীতি? বিদ্যুৎ সংকটের নেপথ্যে জ্বালানি, ডলার, বকেয়া ও আস্থার সংকট উত্তর বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ, ৩ নম্বর সতর্কসংকেত জারি ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ে সংসদে অমিত শাহের লেকচার শুনতে আগ্রহী নই: রাহুল গান্ধী লোহিত সাগর ও ওমান উপসাগরে একদিনে তিন জাহাজে হামলা, নিহত ৬; ৩ পাকিস্তানি ট্রাম্পকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হয় এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে, ইরানি হামলার আশঙ্কায় চমকপ্রদ নিরাপত্তা অভিযান তালেবান শাসনে ২৪ লাখ আফগান কিশোরীর মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ, অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান ইউনেস্কোর বাইডেনের স্বাস্থ্য সংকট ডেমোক্র্যাটদের গভীর রাজনৈতিক সংকটও উন্মোচন করছে লোডশেডিং ঘিরে আতঙ্ক, বিদ্যুৎ অফিসে নিরাপত্তা চেয়ে থানায় আবেদন মশাখালীতে যমুনা এক্সপ্রেস থামিয়ে আন্দোলন, ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ

দিল্লির অননুমোদিত বসতি: অব্যবস্থাপূর্ণ নগরায়ণের ভয়াবহ মানবিক মূল্য

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড ও ভবনধসের ঘটনাগুলো আবারও সামনে এনেছে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ ও অননুমোদিত নির্মাণের দীর্ঘদিনের সংকট। শহরের প্রায় ১,৮০০ অননুমোদিত কলোনিতে বসবাসকারী লাখো মানুষের জীবন প্রতিদিন ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও জীবিকার তাগিদে তারা এসব এলাকায় বসবাস ও কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

৩৫ বছর বয়সী তাহির খানের গল্প সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। এক বছর আগে চাকরি হারানোর পর তিনি হাউজ রানি এলাকার একটি বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট (বি অ্যান্ড বি) প্রতিষ্ঠানে ওয়েটারের কাজ নেন। মাসে ১২ হাজার রুপির এই চাকরিই ছিল তার পরিবারের একমাত্র ভরসা। কিন্তু ৫ জুন তার কর্মস্থল ‘লেমন গ্রিন বি অ্যান্ড বি’ সিলগালা করে দেয় প্রশাসন। অভিযোগ ছিল, ছয় কক্ষের অনুমতি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বহু কক্ষবিশিষ্ট হোটেল হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল।

মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের পর অভিযান

এই অভিযানের পেছনে ছিল ৩ জুনের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। হাউজ রানির ‘ফ্লোরিশ স্টে বি অ্যান্ড বি’-তে আগুন লেগে ২৩ জনের মৃত্যু হয়। প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন ছিল মাত্র ছয়টি কক্ষের জন্য, কিন্তু বাস্তবে সেখানে অন্তত ২৬টি কক্ষ পরিচালিত হচ্ছিল। ভবনটিতে কোনো অগ্নিনির্বাপণ বহির্গমন পথ ছিল না এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত দুর্বল।

The cost of urbanisation in Delhi

নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী বা তাদের স্বজন। গুরগাঁওয়ের আগরওয়াল পরিবারের আট সদস্য ওই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান। পরিবারের কর্তা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং কয়েক দিন পর তিনিও মারা যান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বছরের পর বছর ধরে অনেক আবাসিক ভবন ধীরে ধীরে অনুমোদনবিহীন হোটেল ও গেস্টহাউসে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি ও নিয়ম বাস্তবায়নের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

সাইদুলাজাবে ভবনধসের সতর্কবার্তা

হাউজ রানি থেকে অল্প দূরত্বের সাইদুলাজাব এলাকাতেও সম্প্রতি আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটে। ৩০ মে একটি পাঁচতলা ভবনের অবৈধ সম্প্রসারণকাজ চলাকালে ভবনটি ধসে পড়ে। এতে ছয়জন নিহত হন, যাদের মধ্যে চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও স্থানীয় এক নারী ব্যবসায়ী ছিলেন।

একসময় দ্রুত বিকাশমান নগর গ্রাম হিসেবে পরিচিত সাইদুলাজাব এখন অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণের ঝুঁকির প্রতীক হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কৃষিনির্ভর এলাকা থেকে ভাড়াভিত্তিক আবাসনকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এখানে পরিকল্পনাহীন বহুতল নির্মাণ দ্রুত বেড়েছে।

Regularisation of Unauthorised Colonies is Good, But What About Slums |  NewsClick

দিল্লির ৬০ শতাংশ মানুষের বাস্তবতা

দিল্লির মাস্টার প্ল্যান-২০৪১ এর জন্য প্রস্তুতকৃত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শহরের ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষ অপরিকল্পিত ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাস করেন। এসব এলাকায় নিরাপদ আবাসন, জরুরি সেবা ও মৌলিক অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, সরু গলি, অপর্যাপ্ত সড়ক, জটিল বিদ্যুৎ সংযোগ, খোলা জায়গার অভাব এবং অনুমোদনহীন অতিরিক্ত তলা নির্মাণ জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে অগ্নিনির্বাপণ যানবাহন দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেই পারে না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণই এই ঝুঁকিকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু এলাকায় আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক প্রশস্তকরণ বা অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থার যথাযথ উন্নয়ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

তাহির খানের মতো লাখো মানুষের কাছে এই সংকট কেবল পরিসংখ্যান নয়, প্রতিদিনের বাস্তবতা। জীবিকার প্রয়োজনে তারা এমন ভবনে বাস ও কাজ করছেন, যেগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে তাদের কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবু বিকল্প না থাকায় তারা ঝুঁকির মধ্যেই জীবন চালিয়ে যেতে বাধ্য।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

মোদির পাকিস্তান নীতি: সংলাপহীনতার আড়ালে কি আঞ্চলিক আধিপত্যের রাজনীতি?

দিল্লির অননুমোদিত বসতি: অব্যবস্থাপূর্ণ নগরায়ণের ভয়াবহ মানবিক মূল্য

১০:৫১:৫৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড ও ভবনধসের ঘটনাগুলো আবারও সামনে এনেছে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ ও অননুমোদিত নির্মাণের দীর্ঘদিনের সংকট। শহরের প্রায় ১,৮০০ অননুমোদিত কলোনিতে বসবাসকারী লাখো মানুষের জীবন প্রতিদিন ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও জীবিকার তাগিদে তারা এসব এলাকায় বসবাস ও কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

৩৫ বছর বয়সী তাহির খানের গল্প সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। এক বছর আগে চাকরি হারানোর পর তিনি হাউজ রানি এলাকার একটি বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট (বি অ্যান্ড বি) প্রতিষ্ঠানে ওয়েটারের কাজ নেন। মাসে ১২ হাজার রুপির এই চাকরিই ছিল তার পরিবারের একমাত্র ভরসা। কিন্তু ৫ জুন তার কর্মস্থল ‘লেমন গ্রিন বি অ্যান্ড বি’ সিলগালা করে দেয় প্রশাসন। অভিযোগ ছিল, ছয় কক্ষের অনুমতি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বহু কক্ষবিশিষ্ট হোটেল হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল।

মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের পর অভিযান

এই অভিযানের পেছনে ছিল ৩ জুনের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। হাউজ রানির ‘ফ্লোরিশ স্টে বি অ্যান্ড বি’-তে আগুন লেগে ২৩ জনের মৃত্যু হয়। প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন ছিল মাত্র ছয়টি কক্ষের জন্য, কিন্তু বাস্তবে সেখানে অন্তত ২৬টি কক্ষ পরিচালিত হচ্ছিল। ভবনটিতে কোনো অগ্নিনির্বাপণ বহির্গমন পথ ছিল না এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত দুর্বল।

The cost of urbanisation in Delhi

নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী বা তাদের স্বজন। গুরগাঁওয়ের আগরওয়াল পরিবারের আট সদস্য ওই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান। পরিবারের কর্তা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং কয়েক দিন পর তিনিও মারা যান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বছরের পর বছর ধরে অনেক আবাসিক ভবন ধীরে ধীরে অনুমোদনবিহীন হোটেল ও গেস্টহাউসে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি ও নিয়ম বাস্তবায়নের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

সাইদুলাজাবে ভবনধসের সতর্কবার্তা

হাউজ রানি থেকে অল্প দূরত্বের সাইদুলাজাব এলাকাতেও সম্প্রতি আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটে। ৩০ মে একটি পাঁচতলা ভবনের অবৈধ সম্প্রসারণকাজ চলাকালে ভবনটি ধসে পড়ে। এতে ছয়জন নিহত হন, যাদের মধ্যে চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও স্থানীয় এক নারী ব্যবসায়ী ছিলেন।

একসময় দ্রুত বিকাশমান নগর গ্রাম হিসেবে পরিচিত সাইদুলাজাব এখন অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণের ঝুঁকির প্রতীক হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কৃষিনির্ভর এলাকা থেকে ভাড়াভিত্তিক আবাসনকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এখানে পরিকল্পনাহীন বহুতল নির্মাণ দ্রুত বেড়েছে।

Regularisation of Unauthorised Colonies is Good, But What About Slums |  NewsClick

দিল্লির ৬০ শতাংশ মানুষের বাস্তবতা

দিল্লির মাস্টার প্ল্যান-২০৪১ এর জন্য প্রস্তুতকৃত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শহরের ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষ অপরিকল্পিত ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাস করেন। এসব এলাকায় নিরাপদ আবাসন, জরুরি সেবা ও মৌলিক অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, সরু গলি, অপর্যাপ্ত সড়ক, জটিল বিদ্যুৎ সংযোগ, খোলা জায়গার অভাব এবং অনুমোদনহীন অতিরিক্ত তলা নির্মাণ জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে অগ্নিনির্বাপণ যানবাহন দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেই পারে না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণই এই ঝুঁকিকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু এলাকায় আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক প্রশস্তকরণ বা অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থার যথাযথ উন্নয়ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

তাহির খানের মতো লাখো মানুষের কাছে এই সংকট কেবল পরিসংখ্যান নয়, প্রতিদিনের বাস্তবতা। জীবিকার প্রয়োজনে তারা এমন ভবনে বাস ও কাজ করছেন, যেগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে তাদের কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবু বিকল্প না থাকায় তারা ঝুঁকির মধ্যেই জীবন চালিয়ে যেতে বাধ্য।