কোভিড-১৯ বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের পর এই প্রথমবারের মতো চীনের মাসিক খুচরা বিক্রিতে পতন দেখা গেছে। নতুন সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে দেশটির ভোক্তা পণ্যের খুচরা বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ০.৬ শতাংশ কমেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শক্তিশালী রপ্তানি ও দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদার মধ্যে যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
খুচরা বিক্রির এই পতন ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর প্রথম নেতিবাচক প্রবণতা, যখন কোভিড-সংক্রান্ত বিধিনিষেধের শেষ পর্যায়ে ভোক্তা আস্থার গুরুত্বপূর্ণ সূচক উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।
গাড়ি বিক্রিতে বড় ধাক্কা
মে মাসে চীনের গাড়ি বিক্রি বছরে ২২ শতাংশ কমেছে। চায়না প্যাসেঞ্জার কার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, টানা আট মাস ধরে এই খাতে পতন অব্যাহত রয়েছে। যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকট এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির ভর্তুকি কমিয়ে আনার প্রভাবও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, উৎপাদন সক্ষমতা ও বাজার চাহিদার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা এখন আরও স্পষ্ট। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালনাগত চাপের মুখে পড়ছে।
উৎপাদনে গতি, ভোগে দুর্বলতা
অর্থনীতির অন্যান্য সূচক মিশ্র চিত্র তুলে ধরছে। মে মাসে শিল্প উৎপাদন প্রবৃদ্ধি এপ্রিলের ৪.১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশেষ করে উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ এ প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করেছে।
পিনপয়েন্ট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ ঝিওয়েই ঝ্যাং বলেন, খুচরা বিক্রির সংকোচন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সম্পর্কিত খাতের উত্থান বাজারের জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল না। তার মতে, সরকারি ভর্তুকির সুবিধা কমে যাওয়ায় ভোগব্যয় খাত দুর্বল থাকবে—এমন ধারণা আগেই ছিল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।
বিনিয়োগ ও আবাসন খাতেও চাপ
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগ ৪.১ শতাংশ কমেছে, যা প্রথম চার মাসে ১.৬ শতাংশ হ্রাসের তুলনায় আরও দুর্বল অবস্থান নির্দেশ করে।
একই সময়ে আবাসন খাতে বিনিয়োগ ১৬.২ শতাংশ কমেছে। পাঁচ বছর ধরে চলা রিয়েল এস্টেট খাতের মন্দা কাটার তেমন কোনো লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না। তবে বেইজিং ও সাংহাইসহ বড় শহরগুলোতে নতুন ও পুরোনো বাড়ির দাম এপ্রিলের তুলনায় কিছুটা ধীরগতিতে কমেছে।
‘কে-আকৃতির’ অর্থনীতির বাস্তবতা
সিটি ব্যাংকের অর্থনীতিবিদরা সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে চীনের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘কে-আকৃতির অর্থনীতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, অর্থনীতির একাংশ দ্রুত এগিয়ে গেলেও অন্য অংশ পিছিয়ে পড়ছে।
তাদের মতে, উৎপাদক মূল্যসূচক (পিপিআই) এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলেও পরিবারগুলোর ঋণ কমানোর প্রবণতা এবং করপোরেট ঋণের দুর্বল চাহিদা অভ্যন্তরীণ বাজারের দুর্বলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গত মাসে চীনে কারখানা পর্যায়ের মূল্যস্ফীতি ৩.৯ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ডলার হিসেবে রপ্তানি ১৯.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এপ্রিলের তুলনায় আরও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি।
নীতিগত পদক্ষেপের প্রত্যাশা
বিশ্লেষকদের ধারণা, অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় বাড়াতে এবং রপ্তানিনির্ভরতা কমাতে বেইজিং শিগগিরই আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রণোদনা ঘোষণা করতে পারে। মরগ্যান স্ট্যানলির বিশ্লেষকদের মতে, এপ্রিল ও মে মাসের দুর্বল তথ্য দ্বিতীয় প্রান্তিকের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে জুন থেকেই অবকাঠামো খাতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তাসহ নতুন আর্থিক প্রণোদনা চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















