০৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষত ও অনশনের আর্তনাদ: আমরা কবে শুনব ক্ষুধার ভাষা? শুধু শ্রদ্ধা নয়, শহীদ সেনাদের প্রতি রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব এখনই পালন করতে হবে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিলে বিশেষ সুবিধা বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের সতর্কবার্তা: প্রবৃদ্ধি ৩.৫%, মধ্যমেয়াদে ৩ শতাংশের নিচে নামার শঙ্কা বাগেরহাটে ঘরে মিলল দম্পতির মরদেহ, পাশে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার দেড় মাসের শিশু বিশ্বকাপের পরাজয়ের যন্ত্রণা নয়, অনুভূতিহীনতাই জীবনের সবচেয়ে বড় হার কালেমার পতাকা ইস্যুতে উগ্রবাদী তৎপরতার প্রমাণ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চীনের দল নেই, তবু বিশ্বকাপ জ্বরে উন্মাতাল দেশ; দর্শক, ব্র্যান্ড ও ব্যবসায় নতুন সাফল্যের গল্প বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ১০৮ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণের সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা জোরদারে নতুন উদ্যোগ গভীর সমুদ্র থেকে উঠে এলো শ্যাকলটন ও স্কটের ঐতিহাসিক জাহাজের রহস্যময় ছবি

লেবার পার্টির সংকট এখন শুধু ভোটের নয়, পরিচয়েরও

ব্রিটিশ রাজনীতিতে বহু নির্বাচনী লড়াই এসেছে-গেছে, কিন্তু মেকারফিল্ড উপনির্বাচন যেন অন্য ধরনের এক রাজনৈতিক সংকেত বহন করছে। এখানে প্রশ্ন কেবল কে জিতবে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে—মানুষ আদৌ বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বিশ্বাস করে কি না। এই নির্বাচনে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম কিংবা নাইজেল ফারাজপন্থী প্রার্থী রবার্ট কেনিয়নের মধ্যে যে-ই জিতুন, ফলাফল একটাই বার্তা দেবে: প্রচলিত পেশাদার রাজনীতির প্রতি গভীর অনাস্থা।

আজকের ব্রিটেনে ভোটারদের এক বড় অংশ মনে করছে, রাজনীতি আর তাদের ভাষায় কথা বলে না। বিশেষ করে শ্রমজীবী শহর ও পুরোনো শিল্পাঞ্চলগুলোতে এই বিচ্ছিন্নতা আরও প্রকট। যে লেবার পার্টি একসময় শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করত, সেটিকেই এখন অনেকে দেখে মধ্যবিত্ত নগর-অভিজাতদের দল হিসেবে। অফিস সংস্কৃতি, নীতিকথা, প্রশাসনিক ভাষা আর দূরবর্তী লন্ডন-কেন্দ্রিক মানসিকতা—সব মিলিয়ে দলটি যেন বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরে গেছে।

এই কারণেই অ্যান্ডি বার্নহ্যামের রাজনৈতিক সাফল্য কেবল প্রশাসনিক নয়, সাংস্কৃতিকও। তিনি নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন তিনি প্রতিষ্ঠানের অংশ নন, বরং তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একজন। যদিও বাস্তবে তিনি ব্রিটিশ রাজনীতির বহু স্তর পেরিয়ে আসা এক অভিজ্ঞ নেতা, তবু গত এক দশকে তিনি এমন এক ভাবমূর্তি গড়েছেন যা সাধারণ ভোটারের কাছে তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য মনে হয়। তার পোশাক, ভাষা, আঞ্চলিক পরিচয়, এমনকি জনসমক্ষে আচরণ—সবকিছুতে তিনি সচেতনভাবে ওয়েস্টমিনস্টারের কৃত্রিমতা থেকে দূরত্ব তৈরি করেছেন।

অন্যদিকে রিফর্ম ইউকের কৌশলও একই জায়গায় আঘাত করছে। তারা বুঝে গেছে, মানুষ আর “পেশাদার রাজনীতিক” চায় না। তাই তাদের প্রার্থী একজন প্লাম্বার—একজন হাতে-কলমে কাজ করা মানুষ। এই প্রতীকী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দলটি বলতে চাইছে, রাজনীতি এখন এমন লোকদের হাতে ফিরে যাওয়া উচিত যারা বাস্তব জীবন চেনে, অফিসের করিডর নয়।

Labour's by-election panic has triggered a full-blown identity crisis -  Yahoo News UK

এখানে নীতির চেয়ে সংস্কৃতির প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে। ভোটারদের একাংশ মনে করছে, আধুনিক রাজনীতি এমন এক শ্রেণিকে প্রতিনিধিত্ব করে যারা বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন। যারা অনলাইন মিটিং, প্রশাসনিক ভাষা আর শহুরে পেশাজীবী সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাদের কাছে “কাজ” মানে আর কারখানা, নির্মাণসাইট বা দোকান নয়—বরং স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা। ফলে শ্রমজীবী ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যা কেবল অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভাঙা যাচ্ছে না।

নাইজেল ফারাজ দীর্ঘদিন ধরেই এই অসন্তোষকে ভাষা দিয়ে আসছেন। তার বক্তব্যের কেন্দ্রে এখন শ্রেণি বা বর্ণ নয়, বরং “যারা কাজ করে” এবং “যারা করে না”—এই বিভাজন। এই বক্তব্য নিছক অর্থনৈতিক নয়; এটি সাংস্কৃতিক ক্ষোভেরও বহিঃপ্রকাশ। ফারাজ বোঝাতে চান, বর্তমান রাজনৈতিক শ্রেণি সেইসব মানুষের ভাষা ভুলে গেছে যারা প্রতিদিন বাস্তব পরিশ্রম করে জীবন চালায়।

ব্রেক্সিট গণভোটের সময়ও একই অনুভূতি কাজ করেছিল। তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ভোটকে অনেকে দেখেছিলেন “সাধারণ মানুষের বিজয়” হিসেবে। সেই অনুভূতির কেন্দ্রে ছিল এক ধরনের আঞ্চলিক ক্ষোভ—বিশেষ করে লন্ডনের বাইরে থাকা মানুষের মধ্যে। তাদের ধারণা, জাতীয় রাজনীতি, মিডিয়া ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা সবই রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ফলে দেশের বড় অংশ নিজেকে অবহেলিত মনে করে।

এই বাস্তবতা লেবার পার্টির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ দলটির ঐতিহাসিক ভিত্তিই ছিল সেইসব অঞ্চল, যেগুলো এখন তাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন সরকার অর্থনৈতিক স্বস্তি দেওয়ার নানা উদ্যোগ নিলেও মানুষের একাংশ তা বিশ্বাস করতে পারছে না। কর ছাড়, পারিবারিক ব্যয় কমানোর উদ্যোগ কিংবা দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফেরানোর প্রতিশ্রুতি—এসব পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু আস্থার সংকট এত গভীর যে নীতিগত পরিবর্তনও অনেক সময় মানুষের অনুভূতি বদলাতে পারছে না।

এখানেই মেকারফিল্ডের গুরুত্ব। এই উপনির্বাচন হয়তো একটি আসনের লড়াই, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ব্রিটিশ রাজনীতির বৃহত্তর প্রশ্ন: প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো কি আবার সাধারণ মানুষের ভাষা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারবে?

অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সামনে চ্যালেঞ্জ তাই কেবল একটি আসন জেতা নয়। তাকে প্রমাণ করতে হবে, লেবার এখনও “স্বাভাবিক” মানুষের দল হয়ে উঠতে পারে। যদি তিনি ব্যর্থ হন, তাহলে হয়তো সমস্যাটা আর কেবল নেতৃত্বের থাকবে না; বরং পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষত ও অনশনের আর্তনাদ: আমরা কবে শুনব ক্ষুধার ভাষা?

লেবার পার্টির সংকট এখন শুধু ভোটের নয়, পরিচয়েরও

১১:০০:২৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬

ব্রিটিশ রাজনীতিতে বহু নির্বাচনী লড়াই এসেছে-গেছে, কিন্তু মেকারফিল্ড উপনির্বাচন যেন অন্য ধরনের এক রাজনৈতিক সংকেত বহন করছে। এখানে প্রশ্ন কেবল কে জিতবে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে—মানুষ আদৌ বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বিশ্বাস করে কি না। এই নির্বাচনে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম কিংবা নাইজেল ফারাজপন্থী প্রার্থী রবার্ট কেনিয়নের মধ্যে যে-ই জিতুন, ফলাফল একটাই বার্তা দেবে: প্রচলিত পেশাদার রাজনীতির প্রতি গভীর অনাস্থা।

আজকের ব্রিটেনে ভোটারদের এক বড় অংশ মনে করছে, রাজনীতি আর তাদের ভাষায় কথা বলে না। বিশেষ করে শ্রমজীবী শহর ও পুরোনো শিল্পাঞ্চলগুলোতে এই বিচ্ছিন্নতা আরও প্রকট। যে লেবার পার্টি একসময় শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করত, সেটিকেই এখন অনেকে দেখে মধ্যবিত্ত নগর-অভিজাতদের দল হিসেবে। অফিস সংস্কৃতি, নীতিকথা, প্রশাসনিক ভাষা আর দূরবর্তী লন্ডন-কেন্দ্রিক মানসিকতা—সব মিলিয়ে দলটি যেন বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরে গেছে।

এই কারণেই অ্যান্ডি বার্নহ্যামের রাজনৈতিক সাফল্য কেবল প্রশাসনিক নয়, সাংস্কৃতিকও। তিনি নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন তিনি প্রতিষ্ঠানের অংশ নন, বরং তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একজন। যদিও বাস্তবে তিনি ব্রিটিশ রাজনীতির বহু স্তর পেরিয়ে আসা এক অভিজ্ঞ নেতা, তবু গত এক দশকে তিনি এমন এক ভাবমূর্তি গড়েছেন যা সাধারণ ভোটারের কাছে তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য মনে হয়। তার পোশাক, ভাষা, আঞ্চলিক পরিচয়, এমনকি জনসমক্ষে আচরণ—সবকিছুতে তিনি সচেতনভাবে ওয়েস্টমিনস্টারের কৃত্রিমতা থেকে দূরত্ব তৈরি করেছেন।

অন্যদিকে রিফর্ম ইউকের কৌশলও একই জায়গায় আঘাত করছে। তারা বুঝে গেছে, মানুষ আর “পেশাদার রাজনীতিক” চায় না। তাই তাদের প্রার্থী একজন প্লাম্বার—একজন হাতে-কলমে কাজ করা মানুষ। এই প্রতীকী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দলটি বলতে চাইছে, রাজনীতি এখন এমন লোকদের হাতে ফিরে যাওয়া উচিত যারা বাস্তব জীবন চেনে, অফিসের করিডর নয়।

Labour's by-election panic has triggered a full-blown identity crisis -  Yahoo News UK

এখানে নীতির চেয়ে সংস্কৃতির প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে। ভোটারদের একাংশ মনে করছে, আধুনিক রাজনীতি এমন এক শ্রেণিকে প্রতিনিধিত্ব করে যারা বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন। যারা অনলাইন মিটিং, প্রশাসনিক ভাষা আর শহুরে পেশাজীবী সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাদের কাছে “কাজ” মানে আর কারখানা, নির্মাণসাইট বা দোকান নয়—বরং স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা। ফলে শ্রমজীবী ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যা কেবল অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভাঙা যাচ্ছে না।

নাইজেল ফারাজ দীর্ঘদিন ধরেই এই অসন্তোষকে ভাষা দিয়ে আসছেন। তার বক্তব্যের কেন্দ্রে এখন শ্রেণি বা বর্ণ নয়, বরং “যারা কাজ করে” এবং “যারা করে না”—এই বিভাজন। এই বক্তব্য নিছক অর্থনৈতিক নয়; এটি সাংস্কৃতিক ক্ষোভেরও বহিঃপ্রকাশ। ফারাজ বোঝাতে চান, বর্তমান রাজনৈতিক শ্রেণি সেইসব মানুষের ভাষা ভুলে গেছে যারা প্রতিদিন বাস্তব পরিশ্রম করে জীবন চালায়।

ব্রেক্সিট গণভোটের সময়ও একই অনুভূতি কাজ করেছিল। তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ভোটকে অনেকে দেখেছিলেন “সাধারণ মানুষের বিজয়” হিসেবে। সেই অনুভূতির কেন্দ্রে ছিল এক ধরনের আঞ্চলিক ক্ষোভ—বিশেষ করে লন্ডনের বাইরে থাকা মানুষের মধ্যে। তাদের ধারণা, জাতীয় রাজনীতি, মিডিয়া ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা সবই রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ফলে দেশের বড় অংশ নিজেকে অবহেলিত মনে করে।

এই বাস্তবতা লেবার পার্টির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ দলটির ঐতিহাসিক ভিত্তিই ছিল সেইসব অঞ্চল, যেগুলো এখন তাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন সরকার অর্থনৈতিক স্বস্তি দেওয়ার নানা উদ্যোগ নিলেও মানুষের একাংশ তা বিশ্বাস করতে পারছে না। কর ছাড়, পারিবারিক ব্যয় কমানোর উদ্যোগ কিংবা দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফেরানোর প্রতিশ্রুতি—এসব পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু আস্থার সংকট এত গভীর যে নীতিগত পরিবর্তনও অনেক সময় মানুষের অনুভূতি বদলাতে পারছে না।

এখানেই মেকারফিল্ডের গুরুত্ব। এই উপনির্বাচন হয়তো একটি আসনের লড়াই, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ব্রিটিশ রাজনীতির বৃহত্তর প্রশ্ন: প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো কি আবার সাধারণ মানুষের ভাষা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারবে?

অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সামনে চ্যালেঞ্জ তাই কেবল একটি আসন জেতা নয়। তাকে প্রমাণ করতে হবে, লেবার এখনও “স্বাভাবিক” মানুষের দল হয়ে উঠতে পারে। যদি তিনি ব্যর্থ হন, তাহলে হয়তো সমস্যাটা আর কেবল নেতৃত্বের থাকবে না; বরং পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে।