১৩৪৭ সালের এক শরতের দিনে আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাচীন বন্দরে একটি জাহাজ এসে নোঙর করেছিল। ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের সেই দরজাটি তখন ছিল মিসরের প্রাণকেন্দ্রে প্রবেশের পথ, আর মিসর ছিল শক্তিশালী মামলুক সালতানাতের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। জাহাজটি সম্ভবত কৃষ্ণসাগর অঞ্চল থেকে যাত্রা করেছিল। তাতে ছিল বত্রিশজন বণিক, বড় একটি নাবিকদল এবং মিসরে বিক্রির জন্য আনা বহু দাস। কিন্তু সমুদ্রযাত্রার কোনো এক পর্যায়ে জাহাজের ভেতর ছড়িয়ে পড়েছিল এক অদ্ভুত, নির্মম ও দ্রুতঘাতী রোগ। কারও শরীরে দেখা দিয়েছিল বিকৃত ফোলা ও টিউমারের মতো লক্ষণ, কেউ আবার রক্ত কাশতে কাশতে মৃত্যুর দিকে গিয়েছিল। জাহাজটি যখন আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছাল, তখন বেঁচে ছিল মাত্র কয়েকজন। বন্দরে পৌঁছানোর অল্প সময়ের মধ্যেই তারাও মারা গেল।
ইতিহাসে এই ঘটনাটিই মিসরে ব্ল্যাক ডেথের প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত হয়। ইউরোপীয় ইতিহাসে ব্ল্যাক ডেথ নিয়ে বিপুল আলোচনা আছে, কিন্তু একই সময়ে মুসলিম বিশ্বের ওপর এই মহামারির আঘাত কত গভীর ছিল, তা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। থমাস অ্যাসব্রিজের আলোচনায় দেখা যায়, প্লেগ কেবল ইউরোপের শহর, গ্রাম ও রাজনীতিকেই পাল্টে দেয়নি; উত্তর আফ্রিকা, নিকটপ্রাচ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী সমাজেও এর আঘাত ছিল ভয়াবহ, কোথাও কোথাও আরও বেশি ধ্বংসাত্মক।
ইউরোপের বাইরে মৃত্যুর আরেক মানচিত্র

ব্ল্যাক ডেথকে অনেক সময় ইউরোপকেন্দ্রিক ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। লন্ডন, ফ্লোরেন্স, প্যারিস, ভেনিস বা অ্যাভিনিয়নের মতো শহরের মৃত্যু, ভয়, শোক ও সামাজিক ভাঙনের ছবি ইতিহাসে প্রবলভাবে উপস্থিত। কিন্তু চতুর্দশ শতকের বিশ্ব ছিল বিচ্ছিন্ন নয়। বাণিজ্যপথ, বন্দর, জাহাজ, কাফেলা এবং সাম্রাজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরের দুই প্রান্ত পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। কৃষ্ণসাগর থেকে সিসিলি, আলেকজান্দ্রিয়া থেকে কায়রো, দামেস্ক থেকে আলেপ্পো, এসব অঞ্চল ছিল রোগ বিস্তারের জন্যও এক সংযুক্ত ভূগোল।
মিসরে প্লেগের আগমন তাই কোনো বিচ্ছিন্ন বিপর্যয় ছিল না। এটি ছিল বৃহত্তর এক মহামারির পূর্বপ্রান্ত, যেখানে বাণিজ্যের পথই মৃত্যুর পথ হয়ে উঠেছিল। আলেকজান্দ্রিয়ার বন্দরে যে জাহাজ ভিড়েছিল, সেটি ছিল শুধু একটি বাহন নয়; সেটি ছিল মধ্যযুগীয় বিশ্বব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতীক। যে সমুদ্রপথ পণ্য, মানুষ, সম্পদ ও জ্ঞান বহন করত, একই পথ এবার বহন করল এক অদৃশ্য হত্যাকারীকে।
মামলুক সালতানাতের শক্তির ভেতরে দুর্বলতা
মামলুক সালতানাত সেই সময় ইসলামী বিশ্বের এক প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি। এই রাষ্ট্র মঙ্গোলদের অগ্রযাত্রা রুখেছিল, ক্রুসেডার শক্তিকে পরাজিত করেছিল, এবং মিসর ও সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল শাসন করত। কায়রো ছিল তার রাজধানী, দামেস্ক ছিল তার আরেক গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্র। সামরিক দক্ষতা, প্রশাসনিক কাঠামো ও বাণিজ্যিক অবস্থানের কারণে মামলুকরা নিজেদের যুগে অত্যন্ত শক্তিশালী বলে বিবেচিত হতো।
কিন্তু মহামারি এমন এক শত্রু, যাকে যুদ্ধক্ষেত্রে রোখা যায় না। দুর্গ, অশ্বারোহী বাহিনী, তলোয়ার, করব্যবস্থা বা সামরিক শৃঙ্খলা, এগুলোর কোনোটি প্লেগের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরক্ষা দিতে পারেনি। ব্ল্যাক ডেথ মামলুক রাষ্ট্রের জনসংখ্যা, প্রশাসন, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। এই আঘাত তাৎক্ষণিক মৃত্যুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রাষ্ট্রের ভেতরের শক্তিকে ক্ষয় করে দেয়। পরবর্তী শতকগুলোতে অটোমানদের হাতে মামলুকদের পতনের পেছনে বহু কারণ থাকলেও, প্লেগে বিপর্যস্ত সমাজ ও অর্থনীতি সেই দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি তৈরি করেছিল।

ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও মহামারির বাস্তবতা
মুসলিম বিশ্বের ওপর প্লেগের প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যযুগীয় ইসলামী চিন্তায় প্লেগকে প্রায়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক পরীক্ষা, শাস্তি বা বিশ্বাসীদের জন্য শাহাদতের সুযোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতো। সপ্তম শতকের পূর্ববর্তী প্লেগ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে একটি মত গড়ে উঠেছিল যে প্লেগে আক্রান্ত হওয়া কেবল জীবাণু বা সংক্রমণের ফল নয়, বরং আল্লাহর নির্ধারণ।
সিরিয়ার কবি ও পণ্ডিত ইবন আল-ওয়ার্দি যখন আলেপ্পোতে প্লেগের আঘাত দেখেন, তিনি একদিকে রোগটির ভয়াবহতা বর্ণনা করেন, অন্যদিকে ধর্মীয় ব্যাখ্যা থেকেও সরে আসেন না। তাঁর বিবরণে প্লেগ একদিকে ছিল ভয় ও মৃত্যু, অন্যদিকে তা ছিল বিশ্বাসীর জন্য এক ধরনের পুরস্কার বা শাহাদতের পথ। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্লেগকে কেবল সংক্রামক রোগ হিসেবে দেখা ঠিক নয়; যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তারা আল্লাহর নির্বাচিত।
এই ধারণার একটি বাস্তব প্রভাব ছিল। প্লেগ আক্রান্ত অঞ্চল থেকে পালানো বা আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ করা নিয়ে ইসলামী বিধান ছিল সংযত ও কঠোর। অর্থাৎ, মহামারির সময় বৃহৎ পরিসরে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা মুসলিম সমাজে ইউরোপের তুলনায় কম ছিল। এর ফলে একদিকে রোগ বিস্তারের বিপর্যয় আরও ভয়াবহ হতে পারে, কারণ মানুষ স্থানীয়ভাবে সংক্রমণের ভেতরে থেকে যায়। অন্যদিকে, এই অবস্থান সমাজকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া থেকেও কিছুটা রক্ষা করেছিল, কারণ রোগীকে পরিত্যাগ করা বা পরিবারকে ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া নৈতিকভাবে স্বীকৃত আচরণ হয়ে ওঠেনি।
দামেস্কে মৃত্যুর সিংহাসন
দামেস্কে ব্ল্যাক ডেথের আঘাত ছিল বিশেষভাবে নির্মম। শহরটি তখন মামলুক সালতানাতের অন্যতম প্রধান নগর, ধর্মীয়, বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহামারির আগে এর জনসংখ্যা সম্ভবত প্রায় আশি হাজারের কাছাকাছি ছিল। কিন্তু ১৩৪৮ সালের শেষ ভাগ এবং ১৩৪৯ সালের শুরুতে শহরের মৃত্যুহার এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সমকালীন বর্ণনায় প্লেগকে বলা হয়, যেন সে সিংহাসনে বসা রাজা।
প্রতিদিন হাজারের বেশি মানুষ মারা যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। শহরের মানুষ লাশের সংখ্যায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। প্রশাসনের কাছ থেকে দাফনের অনুমতি নেওয়ার নিয়ম ভেঙে যায়। বাগানে, রাস্তায়, পথের পাশে লাশ পড়ে থাকতে থাকে। মৃত্যু আর ব্যক্তিগত পারিবারিক শোকের ঘটনা ছিল না; তা হয়ে ওঠে নগরজীবনের দৈনন্দিন দৃশ্য।
যে শহর একসময় বাজার, মসজিদ, পাঠচক্র, কাফেলা ও নাগরিক জীবনের শব্দে ভরা ছিল, সেখানে হঠাৎ মৃত্যু হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় উপস্থিতি। মানুষের ভয় শুধু নিজের মৃত্যুকে ঘিরে ছিল না; তারা দেখছিল পুরো সমাজের পরিচিত রূপ ভেঙে পড়ছে। লাশ দাফনের নিয়ম, পারিবারিক আচার, ধর্মীয় কর্তব্য, বাজারের স্বাভাবিকতা, সবকিছু এক অমানবিক চাপে বিপর্যস্ত হচ্ছিল।
কায়রো: জনবহুল রাজধানীর অন্ধকার শীত
দামেস্কের চেয়েও ভয়াবহ ছিল কায়রোর অবস্থা। কায়রো তখন মামলুক সালতানাতের রাজধানী এবং ইসলামী বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নগর। এর জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখের কাছাকাছি ছিল বলে ধারণা করা হয়। এত ঘনবসতিপূর্ণ, বাণিজ্যনির্ভর ও প্রশাসনিকভাবে কেন্দ্রীভূত শহরে প্লেগ ঢুকে পড়ার অর্থ ছিল এক বিপর্যয়ের বিস্ফোরণ।
১৩৪৮ থেকে ১৩৪৯ সালের সেই শীতে কায়রোতে মৃত্যুর সংখ্যা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সমকালীন পর্যবেক্ষকরা মৃতের হিসাব রাখা অসম্ভব বলে মনে করেন। পরিবারের পর পরিবার এক বা দুই রাতের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছিল। প্রত্যেকে যেন ভাবছিল, তারও একই পরিণতি অপেক্ষা করছে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারির চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছিল বলে উল্লেখ আছে। শহরের রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। কায়রো যেন জীবন্ত রাজধানী থেকে পরিত্যক্ত মরুভূমিতে পরিণত হয়।

এই বর্ণনাগুলো শুধু সংখ্যার ইতিহাস নয়। এগুলো একটি নগরের মানসিক পতনের ইতিহাস। এমন একটি শহর, যেখানে ধর্মীয় জীবন, রাজনীতি, ব্যবসা, শিক্ষা ও জনজীবন একত্রে চলত, সেখানে প্রতিটি ঘর শোকের ঘরে পরিণত হয়। কোনো বাড়ির পাশ দিয়ে গেলেই কান্না, বিলাপ, অসুস্থতার শব্দ, মৃত্যু বা দাফনের প্রস্তুতি শোনা যেত। মৃত্যুর ঘনত্ব এত বেশি ছিল যে ব্যক্তিগত ক্ষতিও সমষ্টিগত অসাড়তার ভেতর ঢুকে পড়েছিল।
দাফনের ব্যবস্থা ভেঙে পড়া
মধ্যযুগীয় মুসলিম সমাজে মৃতদেহের প্রতি সম্মান, গোসল, কাফন, জানাজা এবং দাফন ছিল গভীর ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব। কিন্তু কায়রোতে ব্ল্যাক ডেথ সেই আচারগত কাঠামোকেও অচল করে দেয়। এত বিপুল মৃতদেহ সামলানোর মতো জনবল, স্থান, কাঠামো বা সময় ছিল না।
শহরের মসজিদগুলো মৃত ও মুমূর্ষু মানুষের দেহে ভরে উঠতে থাকে। মৃতদেহ ধোয়ার জন্য প্রচলিত ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না, তাই যে উপকরণ পাওয়া যায় তা দিয়েই অস্থায়ী কাঠামো বানানো হয়। মৃতদেহ বহনের জন্য প্রচলিত জানাজার খাটিয়া অপ্রতুল হয়ে পড়ে। ফলে দরজা, মই, কাঠের তক্তা, এমনকি একই বাহনে একাধিক মৃতদেহ বহনের নজির দেখা যায়।
অর্থনৈতিক সংকটও এতে যুক্ত হয়। লাশ বহনকারী, কবর খোঁড়া মানুষ, দাফনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমজীবীরা অতিরিক্ত মজুরি দাবি করতে শুরু করে। কিন্তু সেই আয়ও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; অনেকেই পরে নিজেই প্লেগে মারা যায়। অর্থাৎ, মৃত্যুর বাজার তৈরি হলেও সেই বাজারও মৃত্যুর বাইরে ছিল না।
সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে এসে রাস্তা ও বাজারে মৃতদেহ জমতে থাকে। প্রধান কবরস্থানগুলো পূর্ণ হয়ে গেলে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য হয়ে গণকবরের আশ্রয় নিতে হয়। ইসলামী দাফনরীতির স্বাভাবিক কাঠামো তখন কার্যত ভেঙে পড়ে। একেকটি গর্তে ত্রিশ, চল্লিশ বা আরও বেশি মৃতদেহ ফেলা হচ্ছিল। এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতার ছবি নয়; এটি একটি সভ্য সমাজের ওপর মৃত্যুর এমন চাপের ছবি, যেখানে স্বাভাবিক মানবিক ও ধর্মীয় শৃঙ্খলাও টিকতে পারেনি।
ইউরোপের আতঙ্ক ও মুসলিম সমাজের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া

তবে ব্ল্যাক ডেথের সময় মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও দেখা যায়। ইউরোপের বহু অঞ্চলে সংক্রমণের ভয়ে পরিবার, প্রতিবেশী, চিকিৎসক, বন্ধু, এমনকি ধর্মীয় সেবাদাতারাও রোগীদের এড়িয়ে চলেছে বলে সমকালীন লেখায় উল্লেখ আছে। ভয় এত প্রবল ছিল যে মানুষ কখনও কখনও অসুস্থ আত্মীয়কেও পরিত্যাগ করত। সামাজিক বন্ধন ভেঙে পড়া ছিল ইউরোপীয় প্লেগ অভিজ্ঞতার এক গভীর বৈশিষ্ট্য।
মামলুক অঞ্চলে একই মাত্রার সামাজিক পরিত্যাগের প্রমাণ পাওয়া যায় না। এর একটি কারণ সম্ভবত ধর্মীয় ধারণা। যদি রোগকে আল্লাহর নির্ধারিত পরীক্ষা বা শাহাদতের সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে রোগীর কাছ থেকে পালানো নৈতিকভাবে জটিল হয়ে ওঠে। সংক্রমণ সম্পর্কে অস্বীকার বা সন্দেহ অবশ্য মৃত্যুহার বাড়াতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে এটি রোগীকে সম্পূর্ণ সামাজিকভাবে বর্জিত হওয়া থেকে কিছুটা রক্ষা করে।
এই ভিন্নতা ইতিহাসের এক কঠিন দ্বৈততা দেখায়। যে বিশ্বাস জনস্বাস্থ্যগত দৃষ্টিতে বিপজ্জনক হতে পারে, সেটিই আবার সামাজিক সহমর্মিতা রক্ষা করতে পারে। ইউরোপে সংক্রমণ-ভীতি মানুষকে আলাদা করেছে; মুসলিম সমাজে ধর্মীয় কর্তব্য ও ভাগ্যচেতনা মানুষকে কিছুটা একত্র রেখেছে। ফলে মহামারির অভিজ্ঞতা শুধু চিকিৎসা বা মৃত্যুহারের প্রশ্ন নয়, এটি বিশ্বাস, আচরণ, নৈতিকতা ও সমাজব্যবস্থারও প্রশ্ন।
সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার প্রশ্ন
ব্ল্যাক ডেথের সময় ইউরোপের আরেক অন্ধকার অধ্যায় ছিল ইহুদিদের ওপর নির্যাতন। মহামারির কারণ বোঝার অক্ষমতা, গুজব, ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং সামাজিক আতঙ্ক মিলিয়ে বহু ইউরোপীয় অঞ্চলে ইহুদিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তারা নাকি কূপে বিষ মিশিয়ে মানুষ হত্যা করছে। এই সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে হাজার হাজার ইহুদিকে হত্যা করা হয়।
মুসলিম শাসিত লেভান্ত অঞ্চলে একই ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার উল্লেখ তুলনামূলকভাবে দেখা যায় না। খ্রিস্টান ও ইহুদিরা মুসলিম শাসনের অধীনে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকলেও প্লেগের সময় তাদের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ধরনের গণহিংসার প্রমাণ নেই। বরং দামেস্কে প্লেগের সময় বহু ধর্মের মানুষের একত্র প্রার্থনার নজির পাওয়া যায়। জনতা উপবাস, প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিক আশ্রয়ের মাধ্যমে বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল।
এটি মুসলিম সমাজকে আদর্শায়িত করার বিষয় নয়; বরং ঐতিহাসিক পার্থক্য বোঝার বিষয়। এক অঞ্চলে মহামারি সংখ্যালঘু নিধনের অজুহাত হয়েছে, অন্য অঞ্চলে তা অন্তত নির্দিষ্ট মুহূর্তে সমষ্টিগত ধর্মীয় আবেদন ও সাময়িক সহাবস্থানের দৃশ্য তৈরি করেছে। একই রোগ, একই শতক, কিন্তু সামাজিক প্রতিক্রিয়া ভিন্ন।
মৃত্যু, বিশ্বাস ও রাষ্ট্রের দীর্ঘ ক্ষয়
ব্ল্যাক ডেথের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ছবি হলো লাশ, শোক, খালি রাস্তা, ভাঙা দাফনব্যবস্থা এবং আতঙ্ক। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ছিল আরও গভীর। জনসংখ্যা বিপুলভাবে কমে গেলে কর আদায় কমে যায়, কৃষি ও নগর উৎপাদন ব্যাহত হয়, শ্রমশক্তি সংকুচিত হয়, বাজারে ভারসাম্য নষ্ট হয়। রাষ্ট্রের সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তিও প্রভাবিত হয়। মামলুক সালতানাতের মতো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্যও এই ক্ষয় ছিল বিপজ্জনক।
মহামারি একবার এসে চলে যায়নি। পরবর্তী শতকগুলোতে প্লেগ বারবার ফিরে এসেছে। প্রতিবারই জনজীবন, অর্থনীতি ও প্রশাসনকে আঘাত করেছে। ফলে মামলুক বিশ্বের ক্ষতি ছিল ধারাবাহিক। একটি রাষ্ট্র হয়তো এক যুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে পারে, কিন্তু বারবার জনসংখ্যা হারানো, শ্রমশক্তি হারানো এবং শহুরে কাঠামো বিপর্যস্ত হওয়া রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে।
এই কারণেই ব্ল্যাক ডেথকে শুধু একটি স্বাস্থ্য বিপর্যয় হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি ছিল সাম্রাজ্যিক ইতিহাসেরও মোড় ঘোরানো ঘটনা। মামলুকদের সামরিক গৌরব, ধর্মীয় মর্যাদা এবং বাণিজ্যিক সম্পদ ছিল, কিন্তু প্লেগ তাদের সমাজের ভেতরে এমন ক্ষয় সৃষ্টি করেছিল যা পরবর্তী রাজনৈতিক পতনের পটভূমি তৈরি করে।

ইতিহাসের অদৃশ্য পূর্বদিক
ব্ল্যাক ডেথের ইতিহাসে ইউরোপের জায়গা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি ইতিহাসের মানচিত্রকে কেবল ইউরোপে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে মহামারির প্রকৃত বিশ্বজনীনতা বোঝা যায় না। আলেকজান্দ্রিয়ার বন্দরের সেই জাহাজ, আলেপ্পোর কবি ইবন আল-ওয়ার্দি, দামেস্কের লাশভরা রাস্তা, কায়রোর ভেঙে পড়া দাফনব্যবস্থা, গণকবর, মসজিদে মৃতদেহ, বহু ধর্মের মানুষের প্রার্থনা, এসব মিলেই ব্ল্যাক ডেথের পূর্বদিকের ইতিহাস তৈরি করে।
এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহামারি কেবল জীবাণুর ইতিহাস নয়। এটি মানুষের বিশ্বাসের ইতিহাস, রাষ্ট্রের সহনশীলতার ইতিহাস, নগরজীবনের সীমা, মৃত্যুকে বোঝার ভাষা এবং বিপর্যয়ের সামনে সমাজ কতটা ভেঙে পড়ে বা কতটা একত্র থাকে, তার ইতিহাস।
মুসলিম বিশ্বে ব্ল্যাক ডেথ ছিল ভয়াবহভাবে প্রাণঘাতী। দামেস্ক ও কায়রোর মতো শহরে মৃত্যুর মাত্রা ইউরোপের বহু কেন্দ্রের চেয়েও বেশি ছিল বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু একই সঙ্গে এই অঞ্চল ইউরোপীয় ধরনের সর্বব্যাপী সামাজিক পরিত্যাগ এবং সংখ্যালঘু নিধনের ভয়ংকর চিত্র অনেকাংশে এড়িয়ে গেছে। তাই এই ইতিহাসে শুধু মৃত্যু নেই; আছে বিশ্বাসের জটিলতা, সামাজিক সহমর্মিতার সীমিত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থিতি, এবং মধ্যযুগীয় বিশ্বের এক বৃহত্তর মানবিক বিপর্যয়ের নিঃশব্দ পূর্ব অধ্যায়।
ব্ল্যাক ডেথ ইউরোপকে বদলে দিয়েছিল, এ কথা ইতিহাস বহুবার বলেছে। কিন্তু আলেকজান্দ্রিয়া, দামেস্ক, কায়রো ও আলেপ্পোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই মহামারি ইসলামী পূর্বাঞ্চলকেও ছিন্নভিন্ন করেছিল। শুধু তার স্মৃতি পশ্চিমা ইতিহাসের কেন্দ্রে ততটা জায়গা পায়নি।
থমাস অ্যাসব্রিজ 



















