প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো সম্ভবত শুধু রপ্তানি বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও সহজ করতে চান না। প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক পণ্যের জন্য “সিঙ্গেল উইন্ডো” নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র আরও বড় একটি পদক্ষেপ নিচ্ছে—বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক বাজারে ইন্দোনেশিয়ার দরকষাকষির অবস্থানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
সমস্যা হলো, ইতিহাস দেখায় এ ধরনের কেন্দ্রীকরণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রায়ই বাজারে বিকৃতি এবং আস্থার সংকট তৈরি করে। অনেক সময় এমন কিছু নীতি আসে, যেগুলো ওপর থেকে প্রশাসনিক মনে হলেও ভেতরে বহন করে বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য।
সম্প্রতি মধ্য জাকার্তার সেনায়ান আইনসভা কমপ্লেক্সে প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর দেওয়া বক্তব্য ঠিক তেমনই একটি উদাহরণ। প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক পণ্যের রপ্তানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন সরকারি বিধিমালার মাধ্যমে সরকার শুধু নতুন নিয়ম আনছে না; রাষ্ট্র কৌশলগত পণ্যকে কেবল রাজস্বের উৎস হিসেবে নয়, জাতীয় অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের উপকরণ হিসেবেও দেখতে শুরু করেছে।
নিয়মগুলো কঠোর এবং সরাসরি পুরোনো বাণিজ্য ব্যবস্থার কেন্দ্রে আঘাত হেনেছে। অপরিশোধিত পাম তেল (সিপিও), কয়লা এবং লৌহজাত সংকর ধাতুর মতো বড় পণ্য এখন আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরাসরি রপ্তানি করতে পারবে না। সব রপ্তানি কার্যক্রম সরকারের মনোনীত একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের একক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
প্রেসিডেন্ট এই ব্যবস্থাকে “মার্কেটিং ফ্যাসিলিটি” হিসেবে উল্লেখ করেছেন—একটি জাতীয় বিপণন প্ল্যাটফর্ম, যা পণ্য সংগ্রহ করবে, বৈশ্বিক বাজারে বিক্রি করবে এবং পরে সেই আয় রপ্তানিকারকদের কাছে ফিরিয়ে দেবে। কাগজে-কলমে এই ধারণাটি সহজ এবং যৌক্তিক বলেই মনে হয়। রাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করছে, যা দীর্ঘদিন ধরে অদক্ষতায় ভুগছিল।
কিন্তু বাজার কখনোই শুধু সরকারি ভাষার ভিত্তিতে নীতিকে ব্যাখ্যা করে না। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বুঝতে পারছেন, প্রশাসনিক শব্দের আড়ালে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন লুকিয়ে আছে। রাষ্ট্র এমন একটি ক্ষেত্রে আরও গভীরভাবে প্রবেশ করতে চায়, যা এতদিন বাজার ব্যবস্থার নিয়মে পরিচালিত হয়েছে। “সিঙ্গেল উইন্ডো” শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক ইতিহাসের পুরোনো অধ্যায়গুলো সামনে চলে আসে।
অবশ্য সরকার এমন একটি যুক্তি দিচ্ছে, যা পুরোপুরি অস্বীকার করা কঠিন। রপ্তানিতে কম মূল্য দেখানো দীর্ঘদিন ধরেই বড় সমস্যা। প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম দাম দেখিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যায়, আর সরকার কর ও রয়্যালটির বড় অংশ হারায়।

এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র মনে করছে, নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া জরুরি। রপ্তানির পথ সংকুচিত করা হবে, তদারকি কেন্দ্রীভূত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ দেশের ভেতরে ধরে রাখা হবে। যুক্তি খুবই সরল—সব পণ্য যদি একক চ্যানেলের মাধ্যমে বের হয়, তাহলে অর্থের প্রবাহও সহজে পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
তবে বাজার এটিকে কেবল নিয়ন্ত্রক সংস্কার হিসেবে দেখছে না। তদারকির আড়ালে আরও বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে—রপ্তানি আয়ের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বৈশ্বিক পণ্যের বাজারে ইন্দোনেশিয়ার দরকষাকষির শক্তি বাড়ানো এবং একটি কেন্দ্রীয় জাতীয় বাণিজ্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।
এই ধারণা অনেকের কাছে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পণ্য বাণিজ্য সংস্থার পুরোনো মডেলের প্রতিধ্বনি মনে হচ্ছে। এমন একটি মডেল, যেখানে রাষ্ট্র শুধু নিয়ন্ত্রক নয়, বাজারের প্রধান খেলোয়াড়ও হয়ে ওঠে। এটি আধা-ওপেক ধরনের একটি কাঠামোর পুরোনো স্বপ্নের কথাও মনে করিয়ে দেয়—যেখানে ইন্দোনেশিয়া শুধু বৈশ্বিক বাজারদর অনুসরণ করবে না, বরং তা নির্ধারণের চেষ্টাও করবে।
স্বাভাবিকভাবেই, এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবে কে—তা নিয়ে জল্পনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ বলছেন এটি প্রচলিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়ামের অধীনে যাবে। আবার কেউ আরও আগ্রাসী সম্ভাবনার কথা বলছেন—সংস্থাটি হয়তো ডানান্তারার অধীনে পরিচালিত হবে।
যদি দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি বাস্তব হয়, তাহলে ডানান্তারার ভূমিকা আমূল বদলে যাবে। তখন এটি শুধু রাষ্ট্রের সম্পদ তহবিল থাকবে না; বরং কৌশলগত পণ্যের জাতীয় বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে, যেখানে রপ্তানি মার্জিনভিত্তিক নিয়মিত আয় নিয়ন্ত্রণ করা হবে। অর্থাৎ বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের সমন্বয়ে নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হবে।
রাজস্বের দিক থেকে এই ধারণা সরকারের কাছে আকর্ষণীয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর আরও শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যাবে, বাণিজ্য তথ্য আরও স্বচ্ছ হবে এবং রাষ্ট্রের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখা গেলে রুপিয়াহ শক্তিশালী হবে এবং চলতি হিসাবের ঘাটতিও কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
সমস্যা হলো, অর্থনৈতিক তত্ত্ব বাস্তব প্রয়োগে এতটা নিখুঁত থাকে না। এখানেই বাজারের উদ্বেগের যৌক্তিকতা তৈরি হয়।
ব্যবসায়ী মহলের আশঙ্কা, পূর্ণ কেন্দ্রীকরণ বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কয়লা ও সিপিও খাতের রপ্তানিকারকদের মুনাফা কমে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নমনীয়তা হারিয়ে যেতে পারে, প্রতিষ্ঠানগুলো মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা হারাবে এবং অতিরিক্ত আমলাতন্ত্র অদক্ষতা ও দুর্বল সুশাসনের আশঙ্কা বাড়াবে।
ইন্দোনেশিয়া অতীতেও এমন পথে হেঁটেছে। নব্বইয়ের দশকে নিউ অর্ডার আমলে সিপিও রপ্তানি একক চ্যানেলের মাধ্যমে পরিচালিত হতো পিটি প্রিমা কোমেক্সিন্দোর মাধ্যমে। সেই পরীক্ষা সুখকর ছিল না। বাজারে বিকৃতি তৈরি হয়েছিল, বৈষম্য বেড়েছিল এবং শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
তাই আজ প্রশ্নটি খুবই প্রাসঙ্গিক এবং অস্বস্তিকর—আমরা কি আবারও অতীতের ভুলকে আধুনিক রূপে পুনরাবৃত্তি করছি?
একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা উন্মুক্ত ও ন্যায্য বাণিজ্যের পক্ষে। রাষ্ট্রের উপস্থিতি থাকবে, কিন্তু বাজারকে সরিয়ে দিয়ে নয়। আধুনিক অর্থনীতিতে একটি দেশের শক্তি কেবল নিয়ন্ত্রণের পরিধিতে মাপা হয় না; বরং ব্যবসায়িক পরিবেশ কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা দিয়েও বিচার করা হয়।
সরকারের মূল উদ্দেশ্য বোধগম্য। বহু বছর ধরে পুঁজি পাচার, মূল্য কারসাজি এবং বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা বড় সমস্যা হয়ে রয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান যদি একক দরকষাকষির কেন্দ্র হয়, তাহলে ইন্দোনেশিয়ার দরকষাকষির শক্তি বাড়তে পারে। বিশ্বের অন্যতম বড় পাম তেল ও কয়লা উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার মূল্যগ্রহণকারী থেকে মূল্যনির্ধারকে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক ইতিহাস বারবার একই বাস্তবতা দেখিয়েছে—সৎ উদ্দেশ্যের নীতিও দুর্বল বাস্তবায়নের চাপে ভেঙে পড়ে।
আধুনিক অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ অদৃশ্য সম্পদ হলো আস্থা। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে ইন্দোনেশিয়ার সুনাম রক্ষার জন্য নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতা, বাজারের আস্থা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। এই তিনটি উপাদান একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তাড়াহুড়ো করে বা একপেশেভাবে নেওয়া নীতিকে বাজার ঝুঁকির সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করবে। এর ফল হতে পারে পুঁজি পাচার, বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস এবং ভঙ্গুর অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি।
একটি দেশের অবশ্যই বড় স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে। কিন্তু ইতিহাস শেখায়, বাজারকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত একটি দেশকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি হারাতে বাধ্য করতে পারে—যারা বাজারকে টিকিয়ে রাখে, তাদের আস্থা।
লেখক- পাম অয়েল টেকসই উন্নয়নবিষয়ক একজন বিশ্লেষক।
এদি সুহার্দি 


















