তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে জোসেফ বিজয়ের উত্থান শুধু আরেকজন জনপ্রিয় অভিনেতার রাজনৈতিক আগমন নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্লান্তি ও বিকল্পের আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া এক নতুন প্রত্যাশার প্রতিফলন। ক্ষমতায় এসে তিনি যে জোট সরকার গঠন করেছেন, তাতে কংগ্রেস, ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ এবং বিদুথালাই চিরুথাইগাল কাচ্চির মতো দলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১৯৫২ সালের পর এটাই রাজ্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জোট সরকার। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতীকী সাফল্যের পর এখন তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তিনি কি কার্যকর প্রশাসক হয়ে উঠতে পারবেন?
জোসেফ বিজয়ের সমালোচকেরা প্রথমেই তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাবের কথা তুলছেন। তাঁদের যুক্তি, জনপ্রিয়তা আর শাসনক্ষমতা এক জিনিস নয়। তবে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস অন্যরকম উদাহরণও দেখিয়েছে। বহু সময়েই এমন নেতারা সফল হয়েছেন, যাদের শুরুতে ‘অভিজ্ঞতাহীন’ বলে বাতিল করার চেষ্টা হয়েছিল। তামিলনাড়ুর ইতিহাসে কে কামারাজ সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি। সাধারণ মানুষের আস্থা, প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রামীণ সমাজকে সঙ্গে নেওয়ার সক্ষমতা তাঁকে আজও স্মরণীয় করে রেখেছে।
এই তুলনা শুধু আবেগের জায়গা থেকে আসছে না। বিজয়ের রাজনৈতিক ভাষণে যে বিষয়গুলো বারবার উঠে এসেছে—নারীর নিরাপত্তা, মাদক বিস্তার, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক পক্ষপাত—তা সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গেই মিলে যায়। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা এবং নারীদের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ জমেছে। ফলে জোসেফ বিজয়ের প্রতিশ্রুতিগুলো মানুষের কাছে কেবল নির্বাচনী স্লোগান নয়, বরং বহুদিনের অমীমাংসিত সংকটের সম্ভাব্য সমাধান হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি স্বরাষ্ট্র দপ্তর নিজের হাতে রেখেছেন। এটি রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বার্তাটি স্পষ্ট—আইনশৃঙ্খলা ইস্যুকে তিনি সরকারের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার করতে চান। কিন্তু এখানেই তাঁর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। কারণ অপরাধ দমন শুধু কঠোর ভাষণ বা অভিযানের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার পুলিশ প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমানো, তদন্তের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং বিচারব্যবস্থার গতি বাড়ানো।

নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ কমাতে শুধু নারী পুলিশ সদস্য বাড়ানো যথেষ্ট নয়। অভিযোগ গ্রহণের সুযোগ বাড়তে পারে, কিন্তু বিচার যদি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তাহলে অপরাধীর মনে ভয় তৈরি হয় না। দ্রুত বিচার এবং শাস্তির নিশ্চয়তা—এই দুই উপাদান ছাড়া অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কোনো স্থায়ী পথ নেই। একই সঙ্গে জনপরিসরে পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক নগর প্রশাসনের বহু অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সক্রিয় ও দৃশ্যমান আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
মাদকের প্রশ্নেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তামিলনাড়ুর বহু এলাকায় নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য সহজলভ্য হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তরুণদের মধ্যে অ্যালকোহল ও মাদকের বিস্তার শুধু সামাজিক সংকট নয়, এটি আইনশৃঙ্খলারও বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে মদের দোকান বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এটিকে বৃহত্তর সামাজিক ও প্রশাসনিক কৌশলের অংশ না বানাতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি ফল মিলবে না।
জোসেফ বিজয়ের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে প্রশাসনিক সংস্কারে রূপ দেওয়া। জনপ্রিয়তার ঢেউ অনেককে ক্ষমতায় নিয়ে আসে, কিন্তু শাসনের বাস্তবতা দ্রুত সেই আবেগকে পরীক্ষা করে। মানুষ তাঁর সততা নিয়ে আপাতত সন্দিহান নয়। বরং রাজ্যের বড় একটি অংশ চায় তিনি সফল হোন। কারণ তাঁর সাফল্য মানে শুধু একজন অভিনেতার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা নয়; বরং বহুদিনের হতাশা থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা।
কিন্তু রাজনীতি শেষ পর্যন্ত অভিপ্রায়ের নয়, ফলাফলের খেলা। জোসেফ বিজয় যদি সত্যিই পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার স্বাধীনতা দেন, প্রশাসনকে রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে জবাবদিহির কাঠামোয় আনতে পারেন এবং আইনের শাসনকে দৃশ্যমান করেন, তাহলে তিনি হয়তো প্রমাণ করতে পারবেন—জনপ্রিয়তা থেকে নেতৃত্বে উত্তরণ অসম্ভব নয়।
লেখক: আর কে রাঘবন ভারতের সাবেক সিবিআই পরিচালক
আর কে রাঘবন 



















