যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক শুধু মানুষের মৃত্যু নয়। কখনও কখনও যুদ্ধ এমন কিছুকেও ধ্বংস করে, যা একটি জাতির স্মৃতি, সভ্যতার উত্তরাধিকার এবং মানুষের সম্মিলিত ইতিহাসের অংশ। কম্বোডিয়ার প্রাচীন প্রেহ ভিহিয়ার মন্দিরকে ঘিরে সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতির খবর সেই কঠিন বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক স্থাপনা এখন গোলাবর্ষণ, বিস্ফোরণ এবং সামরিক সংঘাতের দাগ বহন করছে। আর এই ঘটনা কেবল একটি সীমান্ত বিরোধের উপসর্গ নয়; এটি বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষার আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিরও এক কঠিন পরীক্ষা।
প্রেহ ভিহিয়ার মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়। খেমার সভ্যতার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ধারার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক এটি। নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত এই স্থাপনাকে ইউনেস্কো ২০০৮ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর স্থাপত্য, ধর্মীয় গুরুত্ব এবং ঐতিহাসিক অবস্থান একে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক নিদর্শনে পরিণত করেছে। কম্বোডিয়ার মানুষের কাছে এটি জাতীয় পরিচয়ের অংশ; বিশ্বের কাছে এটি মানবসভ্যতার এক অমূল্য সম্পদ।
কিন্তু ইতিহাসের এই প্রতীক এখন আবারও ভূরাজনীতির নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি। থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের কেন্দ্রে থাকা এই মন্দির সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার সময় গুরুতর ক্ষতির শিকার হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাথরের অলংকরণ, প্রবেশপথ, সিঁড়ি এবং কাঠামোগত অংশ। কোথাও কোথাও ধ্বংস এতটাই গভীর যে মূল রূপ পুনর্গঠন করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিস্ফোরিত গোলার ধ্বংসাবশেষ ও অবিস্ফোরিত অস্ত্র এখনও এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্ষা মৌসুমে দুর্বল হয়ে পড়া অংশ ভেঙেও পড়তে পারে।
![]()
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্নও উঠে আসে। কোনো রাষ্ট্র কি সামরিক প্রয়োজনের যুক্তি দেখিয়ে একটি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থাপনার ওপর হামলার বৈধতা দাবি করতে পারে? আন্তর্জাতিক আইন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষার নীতিমালা এ ধরনের যুক্তিকে অত্যন্ত সীমিতভাবে বিবেচনা করে। যুদ্ধক্ষেত্রেও ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ১৯৫৪ সালের হেগ কনভেনশন স্পষ্টভাবে বলেছে, সশস্ত্র সংঘাতের মধ্যেও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সুরক্ষা দিতে হবে। কারণ এগুলো কেবল একটি দেশের সম্পদ নয়; এগুলো মানবজাতির সম্মিলিত উত্তরাধিকার।
এই ঘটনার আরেকটি গভীর দিক হলো রাজনৈতিক মালিকানা বনাম সাংস্কৃতিক দায়িত্বের দ্বন্দ্ব। বহু বছর ধরেই থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া উভয় পক্ষই প্রেহ ভিহিয়ারের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে নিজেদের জাতীয় বর্ণনার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু কোনো ঐতিহ্যের প্রতি দাবি তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই ঐতিহ্যকে রক্ষার প্রতিশ্রুতিও সমানভাবে থাকে। যে স্থাপনাকে ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখা হয়, তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে সাংস্কৃতিক সংযোগের দাবি শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রেহ ভিহিয়ারের ক্ষয়ক্ষতি আমাদের আরও বড় একটি বৈশ্বিক প্রবণতার কথা মনে করিয়ে দেয়। আফগানিস্তানে বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস, মধ্যপ্রাচ্যে প্রাচীন নগরীর ধ্বংসযজ্ঞ, কিংবা ইউক্রেনের ঐতিহাসিক স্থাপনায় হামলা—সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, যুদ্ধ শুধু ভূখণ্ড দখলের লড়াই নয়; এটি ইতিহাস ও স্মৃতির ওপরও আঘাত হানে। সাংস্কৃতিক নিদর্শন ধ্বংসের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের পরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকেও আক্রমণ করা হয়।
![]()
এই কারণেই প্রেহ ভিহিয়ারের ঘটনাকে “দূরবর্তী সীমান্ত সংঘাতের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া” হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি নীরব থাকে, তাহলে বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষার ঘোষণাগুলো ক্রমেই প্রতীকী ও ফাঁপা হয়ে উঠবে। ইউনেস্কোসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত দ্রুত স্বাধীন মূল্যায়ন পরিচালনা করা, ক্ষতির পরিমাণ নথিবদ্ধ করা এবং জরুরি সংরক্ষণ উদ্যোগে সহায়তা করা। কারণ প্রতিটি বিলম্ব মানে আরও ক্ষয়, আরও অপূরণীয় ক্ষতি।
সবচেয়ে বড় সত্য হলো, প্রেহ ভিহিয়ার শুধু কম্বোডিয়ার নয়। এটি সেই দীর্ঘ মানবিক যাত্রার অংশ, যেখানে সভ্যতা যুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার দাবি করে। যদি আধুনিক অস্ত্রের সামনে এমন একটি স্থাপনাও নিরাপদ না থাকে, তাহলে বিশ্বের অন্য ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়বে। তাই এই আঘাতকে কেবল একটি দেশের ক্ষতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মানবসভ্যতার সাংস্কৃতিক স্মৃতির ওপর আঘাত—আর সেই কারণেই এর প্রতিক্রিয়াও বৈশ্বিক হওয়া উচিত।
লেখকঃ কম্বোডিয়ার রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ফাইন আর্টসের রেক্টর এবং দেশটির সংস্কৃতি ও চারুকলা মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপমহাপরিচালক
হেং সোফাডি 



















