০৫:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
রুপির স্থিতিশীলতায় ‘যা প্রয়োজন তাই করবে’ আরবিআই, বললেন গভর্নর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ইঙ্গিত, ‘চুক্তি না হলে অন্য পথ’ হুঁশিয়ারি রুবিওর ভারতে তাপপ্রবাহে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র, চাহিদা ছাড়াল ২৭০ গিগাওয়াট জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান, র‍্যাব ক্যাম্পে হামলার ঘটনায় আটক ২০–২৫ যুবসমাজের কণ্ঠরোধ করে ভবিষ্যৎ রক্ষা করা যায় না ট্রাম্প-ভীতির আমেরিকা এবং এক নারীর অস্বস্তিকর সাহস চিকিৎসাব্যবস্থা যখন শোনে না, রোগীরা তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে যায় তারকা হোটেলের বিলাসবহুল স্যুটে এনসিপির সাক্ষাৎকার, ক্ষোভ তৃণমূল নেতাকর্মীদের হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে, দুই মাসে ৫২৮ শিশুর মৃত্যু সিলেটে হাম-সদৃশ উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৫

পাঙ্ক থেকে হিপ-হপ: মূলধারার বাইরে দাঁড়িয়ে নতুন সংস্কৃতির জন্ম

সংস্কৃতির ইতিহাসে বড় পরিবর্তনগুলো অনেক সময় শুরু হয় প্রান্ত থেকে। মূলধারার বাইরে থাকা কিছু মানুষ, যাদের পোশাক, ভাষা, সঙ্গীত বা জীবনদর্শন প্রচলিত কাঠামোর সঙ্গে খাপ খায় না, তারাই প্রায়শ নতুন যুগের দরজা খুলে দেয়। পরে সেই সংস্কৃতিই বাজার দখল করে, ফ্যাশনের ভাষা বদলে দেয়, করপোরেট ব্র্যান্ডের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। কিন্তু শুরুতে তাদের পরিচয় ছিল একটাই—‘মিসফিট’।

সত্তরের দশকের শেষভাগে লন্ডনের পাঙ্ক আন্দোলন এবং আশির দশকের নিউইয়র্কের হিপ-হপ উত্থান—দুটি ভিন্ন ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতার ফল হলেও তাদের ভেতরে ছিল একই ধরনের বিদ্রোহী শক্তি। একদিকে অর্থনৈতিক হতাশা, অন্যদিকে বর্ণ ও শ্রেণিগত বঞ্চনা—এই দুই বাস্তবতা তরুণদের ঠেলে দিয়েছিল নতুন সাংস্কৃতিক ভাষা তৈরির দিকে। আর এই পরিবর্তনের সাক্ষী ছিলেন কিছু শিল্পী ও আলোকচিত্রী, যারা প্রতিষ্ঠিত সৌন্দর্যবোধের বাইরে গিয়ে সেই সময়কে ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।

সেই সময়ের মূলধারার রক সংস্কৃতি ছিল অনেকটাই পুরুষতান্ত্রিক এবং নির্দিষ্ট নান্দনিকতায় আবদ্ধ। দীর্ঘ চুল, বড় স্টেডিয়াম কনসার্ট, চকচকে প্রচ্ছদ—সবকিছুর মধ্যে ছিল এক ধরনের প্রতিষ্ঠিত রুচির আধিপত্য। সেখানে পাঙ্ক যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই অগোছালো। ছেঁড়া পোশাক, অপরিচ্ছন্ন চেহারা, কর্কশ সঙ্গীত—সবকিছু দিয়ে তারা ঘোষণা করছিল, গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য তারা তৈরি হয়নি।

এই কারণেই শুরুতে পাঙ্ককে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। বড় শিল্পীদের ছবি তোলার দায়িত্ব যাদের হাতে ছিল, তারা নতুন এই ব্যান্ডগুলোকে প্রায় অবহেলার চোখে দেখত। কিন্তু ইতিহাসের মজার বিষয় হলো, অনেক সময় যাদের ‘অযোগ্য’ বা ‘অবাঞ্ছিত’ মনে করা হয়, তারাই ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক মানচিত্র আঁকে। তখনকার অখ্যাত ব্যান্ডগুলোই পরে বিশ্বসঙ্গীতের চেহারা বদলে দেয়।

একই ঘটনা পরে দেখা যায় নিউইয়র্কের হিপ-হপ সংস্কৃতিতে। আশির দশকের শুরুতে ব্রঙ্কস, কুইন্স বা হারলেমের রাস্তায় জন্ম নেওয়া এই সংস্কৃতিকে তখনও বড় রেকর্ড কোম্পানিগুলো গুরুত্ব দিচ্ছিল না। মূলধারার চোখে সেটি ছিল খুব বেশি ‘কাঁচা’, খুব বেশি ‘রাস্তার’। কিন্তু সেই কাঁচামির মধ্যেই ছিল বাস্তবতা, আত্মপরিচয় এবং সৃজনশীলতার বিস্ফোরণ।

হিপ-হপের প্রথম প্রজন্মের শিল্পীরা কেবল গান বানাচ্ছিলেন না; তারা নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা করছিলেন। ডিজে, গ্রাফিতি শিল্পী, ব্রেকড্যান্সার, র‌্যাপার—সবাই মিলে তৈরি করছিলেন এক নতুন সাংস্কৃতিক জগৎ। সেটি ছিল রাষ্ট্র বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের তৈরি কোনো প্রকল্প নয়; বরং শহরের প্রান্তিক তরুণদের নিজস্ব ভাষা।

আজ যখন হিপ-হপ বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী সঙ্গীতধারাগুলোর একটি, তখন সহজেই ভুলে যাওয়া যায় যে একসময় এটিকে ‘অতিরিক্ত রুক্ষ’ বলে বাতিল করা হয়েছিল। এখন যেসব ফ্যাশন ব্র্যান্ড রাস্তার সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রেরণা নেয়, তারা তখন এই মানুষগুলোকেই গুরুত্ব দেয়নি। পাঙ্ক ও হিপ-হপ—দুই ক্ষেত্রেই মূলধারা পরে এসে সেই বিদ্রোহকে পণ্য বানিয়েছে।

তবে এই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত অন্য জায়গায়। যারা এই সংস্কৃতির জন্মের সময় সেখানে ছিলেন, তারা নিজেরাও অনেক ক্ষেত্রে বহিরাগত ছিলেন। একজন নারী আলোকচিত্রী, যিনি প্রচলিত রক সাংবাদিকতার জগতে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না, তিনি হয়তো সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন প্রান্তিক তরুণদের ভাষা। কারণ বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা প্রায়ই মানুষকে অন্যরকম সংবেদনশীল করে তোলে।

এখানেই শিল্পের শক্তি। এটি কেবল জনপ্রিয়তাকে অনুসরণ করে না; বরং এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে সমাজের মূলধারা তখনও তাকাতে শেখেনি। পাঙ্ক এবং হিপ-হপের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, নতুন সংস্কৃতি প্রায়ই জন্ম নেয় অস্বস্তি থেকে, প্রত্যাখ্যান থেকে, কিংবা ‘ফিট না হওয়ার’ অভিজ্ঞতা থেকে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিদ্রোহ হয়তো বাণিজ্যের অংশ হয়ে যায়, কিন্তু শুরুটা থাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিছু তরুণ-তরুণী, কিছু সস্তা যন্ত্র, কিছু ছোট ক্লাব, কিছু দেয়ালচিত্র—আর একগুচ্ছ মানুষ যারা বিশ্বাস করত, নিজেদের ভাষা নিজেরাই তৈরি করতে হবে।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রকৃত জন্ম সম্ভবত সেখানেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

রুপির স্থিতিশীলতায় ‘যা প্রয়োজন তাই করবে’ আরবিআই, বললেন গভর্নর

পাঙ্ক থেকে হিপ-হপ: মূলধারার বাইরে দাঁড়িয়ে নতুন সংস্কৃতির জন্ম

০৭:০১:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬

সংস্কৃতির ইতিহাসে বড় পরিবর্তনগুলো অনেক সময় শুরু হয় প্রান্ত থেকে। মূলধারার বাইরে থাকা কিছু মানুষ, যাদের পোশাক, ভাষা, সঙ্গীত বা জীবনদর্শন প্রচলিত কাঠামোর সঙ্গে খাপ খায় না, তারাই প্রায়শ নতুন যুগের দরজা খুলে দেয়। পরে সেই সংস্কৃতিই বাজার দখল করে, ফ্যাশনের ভাষা বদলে দেয়, করপোরেট ব্র্যান্ডের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। কিন্তু শুরুতে তাদের পরিচয় ছিল একটাই—‘মিসফিট’।

সত্তরের দশকের শেষভাগে লন্ডনের পাঙ্ক আন্দোলন এবং আশির দশকের নিউইয়র্কের হিপ-হপ উত্থান—দুটি ভিন্ন ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতার ফল হলেও তাদের ভেতরে ছিল একই ধরনের বিদ্রোহী শক্তি। একদিকে অর্থনৈতিক হতাশা, অন্যদিকে বর্ণ ও শ্রেণিগত বঞ্চনা—এই দুই বাস্তবতা তরুণদের ঠেলে দিয়েছিল নতুন সাংস্কৃতিক ভাষা তৈরির দিকে। আর এই পরিবর্তনের সাক্ষী ছিলেন কিছু শিল্পী ও আলোকচিত্রী, যারা প্রতিষ্ঠিত সৌন্দর্যবোধের বাইরে গিয়ে সেই সময়কে ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।

সেই সময়ের মূলধারার রক সংস্কৃতি ছিল অনেকটাই পুরুষতান্ত্রিক এবং নির্দিষ্ট নান্দনিকতায় আবদ্ধ। দীর্ঘ চুল, বড় স্টেডিয়াম কনসার্ট, চকচকে প্রচ্ছদ—সবকিছুর মধ্যে ছিল এক ধরনের প্রতিষ্ঠিত রুচির আধিপত্য। সেখানে পাঙ্ক যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই অগোছালো। ছেঁড়া পোশাক, অপরিচ্ছন্ন চেহারা, কর্কশ সঙ্গীত—সবকিছু দিয়ে তারা ঘোষণা করছিল, গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য তারা তৈরি হয়নি।

এই কারণেই শুরুতে পাঙ্ককে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। বড় শিল্পীদের ছবি তোলার দায়িত্ব যাদের হাতে ছিল, তারা নতুন এই ব্যান্ডগুলোকে প্রায় অবহেলার চোখে দেখত। কিন্তু ইতিহাসের মজার বিষয় হলো, অনেক সময় যাদের ‘অযোগ্য’ বা ‘অবাঞ্ছিত’ মনে করা হয়, তারাই ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক মানচিত্র আঁকে। তখনকার অখ্যাত ব্যান্ডগুলোই পরে বিশ্বসঙ্গীতের চেহারা বদলে দেয়।

একই ঘটনা পরে দেখা যায় নিউইয়র্কের হিপ-হপ সংস্কৃতিতে। আশির দশকের শুরুতে ব্রঙ্কস, কুইন্স বা হারলেমের রাস্তায় জন্ম নেওয়া এই সংস্কৃতিকে তখনও বড় রেকর্ড কোম্পানিগুলো গুরুত্ব দিচ্ছিল না। মূলধারার চোখে সেটি ছিল খুব বেশি ‘কাঁচা’, খুব বেশি ‘রাস্তার’। কিন্তু সেই কাঁচামির মধ্যেই ছিল বাস্তবতা, আত্মপরিচয় এবং সৃজনশীলতার বিস্ফোরণ।

হিপ-হপের প্রথম প্রজন্মের শিল্পীরা কেবল গান বানাচ্ছিলেন না; তারা নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা করছিলেন। ডিজে, গ্রাফিতি শিল্পী, ব্রেকড্যান্সার, র‌্যাপার—সবাই মিলে তৈরি করছিলেন এক নতুন সাংস্কৃতিক জগৎ। সেটি ছিল রাষ্ট্র বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের তৈরি কোনো প্রকল্প নয়; বরং শহরের প্রান্তিক তরুণদের নিজস্ব ভাষা।

আজ যখন হিপ-হপ বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী সঙ্গীতধারাগুলোর একটি, তখন সহজেই ভুলে যাওয়া যায় যে একসময় এটিকে ‘অতিরিক্ত রুক্ষ’ বলে বাতিল করা হয়েছিল। এখন যেসব ফ্যাশন ব্র্যান্ড রাস্তার সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রেরণা নেয়, তারা তখন এই মানুষগুলোকেই গুরুত্ব দেয়নি। পাঙ্ক ও হিপ-হপ—দুই ক্ষেত্রেই মূলধারা পরে এসে সেই বিদ্রোহকে পণ্য বানিয়েছে।

তবে এই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত অন্য জায়গায়। যারা এই সংস্কৃতির জন্মের সময় সেখানে ছিলেন, তারা নিজেরাও অনেক ক্ষেত্রে বহিরাগত ছিলেন। একজন নারী আলোকচিত্রী, যিনি প্রচলিত রক সাংবাদিকতার জগতে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না, তিনি হয়তো সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন প্রান্তিক তরুণদের ভাষা। কারণ বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা প্রায়ই মানুষকে অন্যরকম সংবেদনশীল করে তোলে।

এখানেই শিল্পের শক্তি। এটি কেবল জনপ্রিয়তাকে অনুসরণ করে না; বরং এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে সমাজের মূলধারা তখনও তাকাতে শেখেনি। পাঙ্ক এবং হিপ-হপের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, নতুন সংস্কৃতি প্রায়ই জন্ম নেয় অস্বস্তি থেকে, প্রত্যাখ্যান থেকে, কিংবা ‘ফিট না হওয়ার’ অভিজ্ঞতা থেকে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিদ্রোহ হয়তো বাণিজ্যের অংশ হয়ে যায়, কিন্তু শুরুটা থাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিছু তরুণ-তরুণী, কিছু সস্তা যন্ত্র, কিছু ছোট ক্লাব, কিছু দেয়ালচিত্র—আর একগুচ্ছ মানুষ যারা বিশ্বাস করত, নিজেদের ভাষা নিজেরাই তৈরি করতে হবে।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রকৃত জন্ম সম্ভবত সেখানেই।