০৪:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
রুপির স্থিতিশীলতায় ‘যা প্রয়োজন তাই করবে’ আরবিআই, বললেন গভর্নর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ইঙ্গিত, ‘চুক্তি না হলে অন্য পথ’ হুঁশিয়ারি রুবিওর ভারতে তাপপ্রবাহে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র, চাহিদা ছাড়াল ২৭০ গিগাওয়াট জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান, র‍্যাব ক্যাম্পে হামলার ঘটনায় আটক ২০–২৫ যুবসমাজের কণ্ঠরোধ করে ভবিষ্যৎ রক্ষা করা যায় না ট্রাম্প-ভীতির আমেরিকা এবং এক নারীর অস্বস্তিকর সাহস চিকিৎসাব্যবস্থা যখন শোনে না, রোগীরা তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে যায় তারকা হোটেলের বিলাসবহুল স্যুটে এনসিপির সাক্ষাৎকার, ক্ষোভ তৃণমূল নেতাকর্মীদের হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে, দুই মাসে ৫২৮ শিশুর মৃত্যু সিলেটে হাম-সদৃশ উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৫

স্মার্টফোনের পর্দা আর নিঃশব্দ জনসংখ্যা সংকট

বিশ্বজুড়ে জন্মহার কেন এত দ্রুত কমছে—এই প্রশ্ন এখন শুধু অর্থনীতিবিদ বা নীতিনির্ধারকদের আলোচনার বিষয় নয়। এটি ধীরে ধীরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের কেন্দ্রে চলে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে মনে করা হতো, মানুষ কম সন্তান নিচ্ছে মূলত উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, নগরজীবনের চাপ, নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি কিংবা ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রসারের কারণে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরেকটি বিষয় নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে—স্মার্টফোন ও ডিজিটাল জীবনযাপন।

গত এক দশকে বিশ্বের নানা দেশে জন্মহার কমার গতি হঠাৎ বেড়ে গেছে। শুধু ইউরোপ বা আমেরিকা নয়, লাতিন আমেরিকা, উত্তর আফ্রিকা কিংবা এশিয়ার অনেক দেশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কোনো নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে আরও গভীর সামাজিক পরিবর্তন কাজ করছে।

সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের সামাজিক আচরণের রূপান্তর। আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় অনলাইনে কাটাই, কিন্তু বাস্তবে একসঙ্গে থাকার সময় কমে গেছে। তরুণদের বন্ধুত্ব, প্রেম, সম্পর্ক—সবকিছু এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সম্পর্ক গড়ে ওঠার স্বাভাবিক সামাজিক পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

এটি কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের জীবনবোধ বদলে যাওয়ার গল্প। স্মার্টফোন আমাদের মনোযোগের ধরন বদলে দিয়েছে। অবসর সময়, একাকীত্ব, সামাজিক যোগাযোগ—সবকিছু এখন স্ক্রিননির্ভর। মানুষ বাস্তব সম্পর্কের জটিলতা এড়িয়ে দ্রুত বিনোদন, ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা এবং অবিরাম কনটেন্ট প্রবাহের দিকে ঝুঁকছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলার মানসিক প্রস্তুতি কমে যাচ্ছে।

একটি পরিবার গড়ে তোলা মানে শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সময়, ধৈর্য, মানসিক স্থিরতা এবং সামাজিক সংযোগের ওপরও নির্ভর করে। কিন্তু ডিজিটাল সংস্কৃতি মানুষের মনোযোগকে খণ্ডিত করছে। মানুষ ক্রমাগত তুলনার চাপে বাস করছে, সামাজিক মাধ্যমে নিজের জীবনকে অন্যদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছে এবং ধীরে ধীরে এক ধরনের মানসিক ক্লান্তিতে আক্রান্ত হচ্ছে। এর প্রভাব ব্যক্তিগত সম্পর্কেও পড়ছে।

Are screens causing a teen depression? Jean Twenge's new book shows the  link : Shots - Health News : NPR

অবশ্যই জন্মহার কমার জন্য স্মার্টফোন একমাত্র কারণ নয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আবাসন ব্যয়, কর্মজীবনের চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—সবই বড় কারণ। কিন্তু প্রযুক্তি এই সমস্যাগুলোকে আরও গভীর করেছে বলেই মনে হয়। কারণ এটি মানুষকে আরও বিচ্ছিন্ন, আরও একাকী এবং আরও আত্মকেন্দ্রিক করে তুলেছে।

সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হলো—সমাধান কোথায়? কোনো সরকার মানুষের ব্যক্তিগত প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করা বা স্মার্টফোন সীমিত করার মতো ধারণাগুলো বাস্তবসম্মতও নয়।

তাই পরিবর্তনের পথ সম্ভবত সামাজিক সংস্কৃতির ভেতরেই লুকিয়ে আছে। পরিবার, বন্ধুত্ব এবং সরাসরি মানবিক যোগাযোগকে যদি আবার গুরুত্ব দেওয়া যায়, তাহলে ধীরে ধীরে ভারসাম্য ফিরতে পারে। শিশুদের হাতে অল্প বয়সে স্মার্টফোন না তুলে দেওয়া, সামাজিক আড্ডায় ফোন ব্যবহার কমানো কিংবা ব্যক্তিগত সময়কে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বাইরে ফিরিয়ে আনার মতো ছোট পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

সমস্যা হলো, প্রযুক্তির আসক্তি আমরা সবাই জানি, কিন্তু খুব কম মানুষই সেটি থেকে সরে আসতে চায়। কারণ স্মার্টফোন শুধু কাজের মাধ্যম নয়; এটি এখন বিনোদন, পরিচয়, সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ। ফলে এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ তৈরি করা সহজ নয়।

তবু প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। জন্মহার কমে যাওয়া শুধু অর্থনীতির সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যতের সমাজ কেমন হবে, সেই প্রশ্নও। যদি মানুষ ক্রমশ বাস্তব সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে তার প্রভাব শুধু পরিবারে নয়, পুরো সামাজিক কাঠামোতেই পড়বে।

সম্ভবত এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—আমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করব, নাকি প্রযুক্তিই আমাদের সামাজিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া।

জনপ্রিয় সংবাদ

রুপির স্থিতিশীলতায় ‘যা প্রয়োজন তাই করবে’ আরবিআই, বললেন গভর্নর

স্মার্টফোনের পর্দা আর নিঃশব্দ জনসংখ্যা সংকট

০৭:০৮:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬

বিশ্বজুড়ে জন্মহার কেন এত দ্রুত কমছে—এই প্রশ্ন এখন শুধু অর্থনীতিবিদ বা নীতিনির্ধারকদের আলোচনার বিষয় নয়। এটি ধীরে ধীরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের কেন্দ্রে চলে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে মনে করা হতো, মানুষ কম সন্তান নিচ্ছে মূলত উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, নগরজীবনের চাপ, নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি কিংবা ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রসারের কারণে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরেকটি বিষয় নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে—স্মার্টফোন ও ডিজিটাল জীবনযাপন।

গত এক দশকে বিশ্বের নানা দেশে জন্মহার কমার গতি হঠাৎ বেড়ে গেছে। শুধু ইউরোপ বা আমেরিকা নয়, লাতিন আমেরিকা, উত্তর আফ্রিকা কিংবা এশিয়ার অনেক দেশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কোনো নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে আরও গভীর সামাজিক পরিবর্তন কাজ করছে।

সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের সামাজিক আচরণের রূপান্তর। আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় অনলাইনে কাটাই, কিন্তু বাস্তবে একসঙ্গে থাকার সময় কমে গেছে। তরুণদের বন্ধুত্ব, প্রেম, সম্পর্ক—সবকিছু এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সম্পর্ক গড়ে ওঠার স্বাভাবিক সামাজিক পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

এটি কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের জীবনবোধ বদলে যাওয়ার গল্প। স্মার্টফোন আমাদের মনোযোগের ধরন বদলে দিয়েছে। অবসর সময়, একাকীত্ব, সামাজিক যোগাযোগ—সবকিছু এখন স্ক্রিননির্ভর। মানুষ বাস্তব সম্পর্কের জটিলতা এড়িয়ে দ্রুত বিনোদন, ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা এবং অবিরাম কনটেন্ট প্রবাহের দিকে ঝুঁকছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলার মানসিক প্রস্তুতি কমে যাচ্ছে।

একটি পরিবার গড়ে তোলা মানে শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সময়, ধৈর্য, মানসিক স্থিরতা এবং সামাজিক সংযোগের ওপরও নির্ভর করে। কিন্তু ডিজিটাল সংস্কৃতি মানুষের মনোযোগকে খণ্ডিত করছে। মানুষ ক্রমাগত তুলনার চাপে বাস করছে, সামাজিক মাধ্যমে নিজের জীবনকে অন্যদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছে এবং ধীরে ধীরে এক ধরনের মানসিক ক্লান্তিতে আক্রান্ত হচ্ছে। এর প্রভাব ব্যক্তিগত সম্পর্কেও পড়ছে।

Are screens causing a teen depression? Jean Twenge's new book shows the  link : Shots - Health News : NPR

অবশ্যই জন্মহার কমার জন্য স্মার্টফোন একমাত্র কারণ নয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আবাসন ব্যয়, কর্মজীবনের চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—সবই বড় কারণ। কিন্তু প্রযুক্তি এই সমস্যাগুলোকে আরও গভীর করেছে বলেই মনে হয়। কারণ এটি মানুষকে আরও বিচ্ছিন্ন, আরও একাকী এবং আরও আত্মকেন্দ্রিক করে তুলেছে।

সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হলো—সমাধান কোথায়? কোনো সরকার মানুষের ব্যক্তিগত প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করা বা স্মার্টফোন সীমিত করার মতো ধারণাগুলো বাস্তবসম্মতও নয়।

তাই পরিবর্তনের পথ সম্ভবত সামাজিক সংস্কৃতির ভেতরেই লুকিয়ে আছে। পরিবার, বন্ধুত্ব এবং সরাসরি মানবিক যোগাযোগকে যদি আবার গুরুত্ব দেওয়া যায়, তাহলে ধীরে ধীরে ভারসাম্য ফিরতে পারে। শিশুদের হাতে অল্প বয়সে স্মার্টফোন না তুলে দেওয়া, সামাজিক আড্ডায় ফোন ব্যবহার কমানো কিংবা ব্যক্তিগত সময়কে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বাইরে ফিরিয়ে আনার মতো ছোট পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

সমস্যা হলো, প্রযুক্তির আসক্তি আমরা সবাই জানি, কিন্তু খুব কম মানুষই সেটি থেকে সরে আসতে চায়। কারণ স্মার্টফোন শুধু কাজের মাধ্যম নয়; এটি এখন বিনোদন, পরিচয়, সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ। ফলে এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ তৈরি করা সহজ নয়।

তবু প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। জন্মহার কমে যাওয়া শুধু অর্থনীতির সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যতের সমাজ কেমন হবে, সেই প্রশ্নও। যদি মানুষ ক্রমশ বাস্তব সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে তার প্রভাব শুধু পরিবারে নয়, পুরো সামাজিক কাঠামোতেই পড়বে।

সম্ভবত এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—আমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করব, নাকি প্রযুক্তিই আমাদের সামাজিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া।