ভারতের আসাম সরকার রাজ্য বিধানসভায় ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি) বিল উত্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এই রাজ্যটি বিজেপি শাসিত তৃতীয় রাজ্যে পরিণত হলো, যেখানে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি বণ্টনের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে সব নাগরিকের জন্য একক আইন প্রণয়নের লক্ষ্যেই এই বিল আনা হয়েছে।
সোমবার আসামের মন্ত্রী অতুল বরা ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড আসাম বিল, ২০২৬’ বিধানসভায় উত্থাপন করেন। আগামী মঙ্গলবার, যা নতুন গঠিত ১৬তম বিধানসভার প্রথম অধিবেশনের শেষ দিন, সেদিন বিলটি নিয়ে আলোচনা ও ভোটাভুটির সম্ভাবনা রয়েছে।
ইউসিসি নিয়ে বিজেপির দীর্ঘদিনের অবস্থান
ভারতের সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে ইউনিফর্ম সিভিল কোডের কথা উল্লেখ রয়েছে। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালার অংশ হিসেবে বিবেচিত হলেও স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনই কার্যকর রয়েছে।

ভারতীয় জনতা পার্টি বহুদিন ধরেই সারা দেশে ইউসিসি চালুর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। দলটির আদর্শিক অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এর আগে অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ এবং সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার—এই দুই লক্ষ্য পূরণ করেছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার।
রাজ্যভিত্তিক ইউসিসি বাস্তবায়নের দৌড়ে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম রাজ্য হিসেবে উত্তরাখণ্ড আইন পাস করে। পরে মার্চে গুজরাটও একই পথে হাঁটে। এছাড়া মধ্যপ্রদেশে খসড়া প্রণয়নের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। গোয়ায় আগে থেকেই পর্তুগিজ দেওয়ানি বিধি থেকে উদ্ভূত একটি অভিন্ন সিভিল কোড কার্যকর রয়েছে।
আসামে কী থাকছে ইউসিসিতে
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারে ইউসিসি চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। গত ১৩ মে রাজ্য মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই বিলটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
যদিও বিলের পূর্ণাঙ্গ খুঁটিনাটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবু মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, পাহাড়ি ও সমতলের সব আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ইউসিসির আওতার বাইরে রাখা হবে। উত্তরাখণ্ড ও গুজরাটের মডেল অনুসরণ করেই এই ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, প্রথা ও ঐতিহ্যও এই আইনের আওতার বাইরে থাকবে। তবে বিয়ের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ, নারীদের পারিবারিক সম্পত্তিতে অধিকার সুরক্ষা, বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করা, লিভ-ইন সম্পর্কের স্বীকৃতি এবং বিয়ে ও তালাক বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের মতো বিষয়গুলো আইনে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
জনসংখ্যা ও রাজনৈতিক গুরুত্ব
২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, আসামের মোট জনসংখ্যার ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশ আদিবাসী এবং ৩৪ দশমিক ২২ শতাংশ মুসলিম। ফলে ইউসিসি নিয়ে রাজ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিজেপি নেতৃত্ব দাবি করছে, এই আইন নারীর অধিকার ও আইনি সমতা নিশ্চিত করবে। তবে বিরোধীরা একে ধর্মীয় বৈচিত্র্যের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। বিলটি পাস হলে আসাম ভারতের অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিতর্কে নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















