ভারতের রাজনীতিতে একসময় বামপন্থীদের ছিল শক্তিশালী অবস্থান। পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও ত্রিপুরার মতো বড় রাজ্য দীর্ঘ সময় শাসন করেছে কমিউনিস্ট দলগুলো। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই শক্তি এখন অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত। কেরালায় বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ১৯৫৭ সালের পর এই প্রথম ভারতে কোনো কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার থাকছে না।
একসময় ভারতের ১০ কোটির বেশি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেছিল কমিউনিস্ট আন্দোলন। শ্রমিক সংগঠন, কৃষক আন্দোলন, ছাত্র রাজনীতি ও সংগঠিত দলীয় কাঠামোর মাধ্যমে বামপন্থীরা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে বড় ভূমিকা রেখেছিল। পশ্চিমবঙ্গে টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট। ত্রিপুরাতেও কয়েক দশক ধরে শক্ত অবস্থানে ছিল তারা।
কেরালার আলাদা রাজনৈতিক বাস্তবতা

কেরালায় অবশ্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন ছিল। সেখানে বামপন্থী ও কংগ্রেস জোট পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় এসেছে। ১৯৫৭ সালে বিশ্বের অন্যতম প্রথম নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হয়েছিল এই রাজ্যে। শিক্ষার হার, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কেরালার বাম সরকার আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশংসা পেয়েছিল।
তবে অর্থনৈতিক চাপ, বিদেশি আয়ের ওপর নির্ভরতা এবং যুবকদের কর্মসংস্থানের সংকট ধীরে ধীরে এই মডেলকে দুর্বল করে তোলে। একই সঙ্গে বামপন্থী দলগুলোও আগের অবস্থান থেকে সরে এসে বেসরকারি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে ঝুঁকতে শুরু করে।
কেন কমছে বামপন্থীদের প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের রাজনীতিতে শ্রেণিভিত্তিক রাজনীতির জায়গা এখন দখল করেছে ধর্ম, জাতপাত, জাতীয়তাবাদ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তা। বাজারমুখী অর্থনীতি ও নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাও বামপন্থীদের পুরোনো রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

একসময় কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান মুখ ছিল বামপন্থীরা। কিন্তু এখন সেই জায়গায় উঠে এসেছে আঞ্চলিক দল ও স্বতন্ত্র সংগঠনগুলো। ২০২০ সালের কৃষক আন্দোলনেও বাম দলগুলো অংশ নিলেও নেতৃত্বে ছিল না।
পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বড় ধাক্কা
পশ্চিমবঙ্গ একসময় ভারতের বাম রাজনীতির কেন্দ্র ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনে ২৯৪ আসনের বিধানসভায় মাত্র একটি আসনে জয় পেয়েছে সিপিআই(এম)। ভোটের হারও নেমে এসেছে খুবই কম পর্যায়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, শিল্পায়নের নামে জমি অধিগ্রহণের বিতর্ক এবং দীর্ঘ শাসনের ক্লান্তি বামপন্থীদের জনসমর্থন কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে দলটি নিজেদের আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেনি।

নতুন প্রজন্মকে সামনে আনার চেষ্টা
দলের নেতারা বলছেন, বাম রাজনীতির পুনর্জাগরণের চেষ্টা চলছে। তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা হচ্ছে এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, সংসদীয় আসন কমলেও সমাজে বামপন্থীদের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, ভারতের বামপন্থীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নতুন অর্থনীতি, তরুণ ভোটার এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক ভাষার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















