কোরবানির ঈদ ঘিরে প্রতি বছরই দেশের চামড়ার বাজারে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়। কারণ কোরবানির পশুর চামড়া দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রফতানি খাতের কাঁচামাল। কিন্তু চলতি বছরও সেই বাজারে ফিরেছে পুরোনো সংকট। সরকার গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম বাড়ালেও বাস্তবে সেই দামে বিক্রি হচ্ছে না কাঁচা চামড়া। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা প্রতিনিধি ও কোরবানিদাতারা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর পোস্তা, সায়েন্স ল্যাব, কলাবাগান, টাউন হল ও ধানমন্ডি এলাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ছোট আকারের গরুর কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। মাঝারি চামড়ার দাম পাওয়া গেছে ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা এবং বড় চামড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। অথচ সরকারি হিসাবে ছোট চামড়ার দাম হওয়ার কথা ছিল ৬৫০ থেকে ৮৫০ টাকা পর্যন্ত।
সরকারি দর আর বাস্তব বাজারের ফারাক
চলতি বছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করেছে, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। ছাগলের চামড়ার দামও নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ২০ থেকে ২৫ টাকা।
কিন্তু বাস্তবে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যায়নি। ব্যবসায়ীদের ভাষায়, সরকারি দর শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। মাঠপর্যায়ে ট্যানারি, আড়তদার ও ফড়িয়াদের নির্ধারিত কম দামের কারণেই বাজারে কাঙ্ক্ষিত মূল্য মিলছে না।
পোস্তার বাজারে ব্যস্ততা, কিন্তু হতাশা
রাজধানীর পোস্তা এলাকায় সকাল থেকেই চামড়ার বাজার জমে ওঠে। বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাক, পিকআপ ও ভ্যানে করে চামড়া নিয়ে আসেন মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মাদ্রাসার প্রতিনিধিরা। কোথাও চামড়া বাছাই, কোথাও সংরক্ষণের জন্য লবণ লাগানো, আবার কোথাও দরদাম নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতে দেখা যায়।
তবে সেই ব্যস্ততার মধ্যেও অনেক বিক্রেতার চোখেমুখে ছিল হতাশার ছাপ। যারা অগ্রিম টাকা দিয়ে চামড়া সংগ্রহ করেছেন, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির আশঙ্কায় আছেন। মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রতিনিধিরাও বলছেন, চামড়া বিক্রির অর্থ তাদের শিক্ষা ও খাদ্য ব্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু কম দামে বিক্রি হওয়ায় এবার সেই আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
কলাবাগানের মৌসুমি ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন জানান, গত বছর যেসব চামড়া ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন, এবার সেগুলোর জন্য ৬৫০ টাকার বেশি দাম পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, প্রত্যাশিত দামে বিক্রি করতে না পেরে অনেক ব্যবসায়ী লোকসানের মুখে পড়েছেন।
কম দামের জন্য দায়ী কারা
মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্যানারি পর্যায় থেকেই কম দামের চাপ তৈরি হচ্ছে। ট্যানারি মালিকরা উৎপাদন খরচ বেড়েছে বলে বেশি দামে চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে আড়তদার ও ফড়িয়ারাও কম দামে চামড়া সংগ্রহ করছেন।
চামড়া ব্যবসায়ীদের দাবি, শুধু কেনাবেচা নয়, সংরক্ষণ, লবণ, পরিবহন ও শ্রমিক ব্যয়ও বেড়েছে। এতে পুরো বাজারেই চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী বলছেন, বেশি দামে চামড়া কিনলে পরে লোকসান গুনতে হবে।
তবে ট্যানারি মালিকদের বক্তব্য ভিন্ন। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, বাস্তবে দাম খুব বেশি কমেনি। তাদের দাবি, বিকালের দিকে বাজার আরও সক্রিয় হলে দাম কিছুটা বাড়তে পারে।
ছাগলের চামড়ায় ভয়াবহ সংকট
গরুর চামড়ার তুলনায় ছাগলের চামড়ার বাজার পরিস্থিতি আরও খারাপ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একটি ছাগলের চামড়া মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। কোথাও আবার বিনামূল্যেও চামড়া দিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ছাগলের চামড়ার চাহিদা কমে যাওয়ায় কয়েক বছর ধরেই এই সংকট চলছে। ফলে অনেক ব্যবসায়ী ছাগলের চামড়া কিনতেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
সম্ভাবনাময় খাতেও কাটছে না সংকট
একসময় দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রফতানি খাত হিসেবে বিবেচিত হতো চামড়া শিল্প। কিন্তু পরিবেশবান্ধব ট্যানারি গড়ে তুলতে ব্যর্থতা, সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর অব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে না পারা এবং সংরক্ষণ সংকটের কারণে খাতটি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু সরকারি দর নির্ধারণ করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে সেই দর কার্যকর করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ট্যানারি শিল্পকে আধুনিক ও রফতানিযোগ্য মানে উন্নীত করা না গেলে প্রতি বছরই কোরবানির ঈদে চামড়ার বাজারে একই সংকট ফিরে আসবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















