প্রায় ১৮০ বছর আগে আর্কটিকের বরফে হারিয়ে যাওয়া ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ ‘এইচএমএস ইরেবাস’-এর রহস্যে এবার নতুন অধ্যায় যোগ হয়েছে। আধুনিক ডিএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে জাহাজটির তিন নাবিকের পরিচয় শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া কিছু দুর্লভ নিদর্শনও প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে প্রদর্শনের প্রস্তুতি চলছে।
১৮৪৫ সালে অভিযানে বের হওয়া এইচএমএস ইরেবাস ও এইচএমএস টেরর উত্তর-পশ্চিম সমুদ্রপথ খুঁজতে আর্কটিক অঞ্চলে যাত্রা করেছিল। কিন্তু চরম ঠান্ডা আর বরফে আটকে পড়ে জাহাজ দুটির সব আরোহী শেষ পর্যন্ত মারা যান। দীর্ঘদিন ধরে এই অভিযানকে ঘিরে রহস্য, ভয়াবহতা ও মানবিক ট্র্যাজেডির গল্প ইতিহাসে আলোচিত হয়ে আসছে।
নতুন ডিএনএ গবেষণায় যা মিলল
কানাডার গবেষকেরা মৃত নাবিকদের হাড়ের নমুনার সঙ্গে জীবিত বংশধরদের ডিএনএ মিলিয়ে তিনজন নাবিককে শনাক্ত করেছেন। তারা হলেন নাবিক উইলিয়াম ওরেন, কেবিন বয় ডেভিড ইয়ং এবং স্টুয়ার্ড জন ব্রিজেন্স। এছাড়াও অন্য জাহাজের কর্মকর্তা হ্যারি পেগলারের পরিচয়ও নিশ্চিত হয়েছে।
গবেষকেরা জানান, বিভিন্ন দেশের শতাধিক পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে বহু পরিবারের দীর্ঘদিনের অজানা ইতিহাসেরও সমাধান মিলেছে।
বরফের মৃত্যুফাঁদ
১৮৪৬ সালে জাহাজ দুটি বরফে আটকে পড়ে। দুই বছর অপেক্ষার পর জীবিত থাকা নাবিকেরা পায়ে হেঁটে বাঁচার চেষ্টা করেন। কিন্তু তীব্র ঠান্ডা, খাদ্য সংকট ও রোগে একে একে সবাই মারা যান। গবেষকদের ধারণা, অপুষ্টি, স্কার্ভি কিংবা সীসাজনিত বিষক্রিয়ার মতো কারণ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
আগের গবেষণায় কিছু কঙ্কালে নরখাদকের প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল, যা অভিযানের করুণ বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে।

ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের আবেগ
ডেভিড ইয়ং নামে তরুণ কেবিন বয়ের মুখাবয়বও নতুনভাবে পুনর্গঠন করেছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। গবেষকদের মতে, এই ধরনের পুনর্গঠন অতীতের মানুষদের বর্তমান প্রজন্মের কাছে আরও জীবন্ত করে তোলে।
একই সঙ্গে জাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার হওয়া বাটি, জুতা, বেল্টের বকলস ও ওষুধের পাত্রের মতো জিনিস প্রদর্শনীতে রাখা হবে। এগুলো বহু বছর বরফের নিচে সংরক্ষিত ছিল।
দুই শতকের ইতিহাসের পুনর্জাগরণ
১৮২৬ সালে নির্মিত এইচএমএস ইরেবাস মূলত যুদ্ধজাহাজ হিসেবে তৈরি হলেও পরে মেরু অভিযানের জন্য ব্যবহার করা হয়। শক্ত কাঠামোর কারণে এটি বরফাচ্ছন্ন সমুদ্রে চলাচলের জন্য উপযোগী ছিল। বহু সফল অভিযানের পর শেষ পর্যন্ত আর্কটিকের বরফেই এর করুণ সমাপ্তি ঘটে।
এখন নতুন এই গবেষণা ও প্রদর্শনী ইতিহাসপ্রেমীদের মধ্যে আবারও আগ্রহ তৈরি করেছে। গবেষকদের বিশ্বাস, হারিয়ে যাওয়া এই নাবিকদের পরিচয় ফিরে পাওয়া শুধু ইতিহাসের আবিষ্কার নয়, বরং তাদের পরিবারের জন্যও আবেগঘন এক মুহূর্ত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















