লক্ষ্মীর ভান্ডারের বদলে চালু হয়েছে অন্নপূর্ণা যোজনা। আবেদন যাচাইয়ের পরে দেয়া হবে দ্বিগুণ ভাতা।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, লক্ষ্মীর ভান্ডারের ভাতা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হবে। ক্ষমতায় আসার পরে তাদের ঘোষণা, দ্বিগুণ অংকের ভাতা দেয়া হবে উপভোক্তাদের নতুন করে ঝাড়াই-বাছাই করে।
নয়া সরকারের প্রকল্প
তৃণমূল সরকার ২০২১ সালে তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পরে শুরু করে লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প। ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী, সোয়া দুই কোটি নারী এই প্রকল্পে প্রতি মাসে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পেতেন। সাধারণ শ্রেণির জন্য এই অংক দেড় হাজার টাকা। তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য আরো ২০০ টাকা বেশি।
এই প্রকল্প খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। তৃণমূল সরকারের পক্ষে নারীদের সমর্থনের বড় ভিত্তি প্রস্তুত করেছিল লক্ষ্মীর ভান্ডার। সরকার বদলের পরে এই প্রকল্পে কিছু বদল আনা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তারা প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না।
বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের প্রথম পর্যায়ে ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ে। এর অর্ধেক যদি নারী ভোটার মনে করা হয়, তারা প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না। রাজ্য সরকার ঘোষণা করেছে, যাদের নাম ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন, তাদের বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা প্রকল্পের সুবিধা পাবেন।
পয়লা জুন থেকে নয়া প্রকল্প কার্যকর হবে। তবে প্রথম দিন থেকেই সবাই অন্নপূর্ণ প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না।
ফর্মের তফাৎ
বুধবার রাজ্য সরকার অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য আবেদনের নির্দিষ্ট ফর্ম প্রকাশ করেছে। লক্ষ্মীর ভান্ডারে আবেদনের জন্য যে ধরনের ফর্ম পূরণ করে জমা দিতে হতো, এটা তার থেকে আলাদা।
লক্ষ্মীর ভান্ডারের ক্ষেত্রে যে ফর্ম ছিল, সেটাতে উপভোক্তা সংক্রান্ত তথ্য দিতে হত। তবে অন্নপূর্ণা যোজনার বারো পাতার ফর্মে উপভোক্তার পরিবারের সদস্যদেরও বিবরণ দিতে হচ্ছে। তাদের আর্থিক অবস্থা নিরূপণ করা যায় এমন একাধিক প্রশ্ন ফর্মে রয়েছে।
যারা লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে আর্থিক অনুদান পেতেন, তাদের সকলেই ভবিষ্যতে এর সুবিধা পাবেন, এমনটা নয়। আগের প্রকল্পে উপভোক্তার আর্থিক অবস্থাকে মানদণ্ড হিসেবে দেখা হত না। কিন্তু, সেই নীতিতে বদল আসছে। অন্নপূর্ণা যোজনার বাইরে থাকবেন আয়করদাতা নারীরা। সরকারি বা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় চলা প্রতিষ্ঠানে যে নারীরা চাকরি করেন, তারাও এই সুবিধা পাবেন না।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, আপাতত লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ হচ্ছে না। আবেদনের ভিত্তিতে যারা উত্তীর্ণ হবেন, তারা অন্নপূর্ণা যোজনায় প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা পাবেন। ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সের নারীদের এই ভাতা দেয়া হবে।
আগের প্রকল্পে দুর্নীতি
তৃণমূল সরকারের আমলে এই ভাতা প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ করছে তাদের উত্তরসূরিরা। সেই কারণেই কোটি কোটি উপভোক্তাকে ফের ফর্ম পূরণ করতে হচ্ছে। বিজেপি সরকারের বক্তব্য, উপভোক্তা তালিকা থেকে সব বেনোজল বার করে যোগ্য প্রাপকদের হাতে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা তুলে দেয়া হবে।
এমন কত নাম থাকতে পারে? মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, কমবেশি ৩০ লক্ষ এমন নাম থাকতে পারে। তাদের এই প্রকল্পের আওতায় থাকার কথা নয়। এর মধ্যে অনুপ্রবেশকারী, মৃত, ডুপ্লিকেট, অনুপস্থিত, ডিলিটেড ভোটাররা রয়েছেন।
অনিয়মের উদাহরণ হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী একজন উপভোক্তার নাম প্রকাশ্যে এনেছেন, যিনি আদতে পুরুষ। মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের বাসিন্দা রাকিবুল শেখ এতদিন লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছিলেন। তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় ডিডাব্লিউকে বলেন, “ফর্মে বিভিন্ন তথ্য চাওয়া হয়েছে মানেই এটা নয় যে উপভোক্তাকে বাদ দেয়া হবে। এই তথ্য সরকার রেখে দিতে চাইছে। সরকারি চাকরিরতরা যে বাদ যাবেন, সেটা আগে বলা হয়েছে। কিন্তু যিনি বেসরকারি চাকরি করেন, আয়কর দেন, তার গৃহিণী যদি চাকরি না করেন, সেক্ষেত্রে কী হবে সেটা রাজ্যে এখনো স্পষ্টভাবে জানায়নি। সরকার ফিল্টার করে সঠিক উপভোক্তার হাতে ভাতা তুলে দিতে চাইছে, এটা সদর্থক বলে মনে করি।”
অর্থনীতি না গণিত
বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারে যে সংকল্পপত্র জারি করেছিল, তাতে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া ছিল। নতুন সরকার শপথ নেয়ার পরে এখন তারা কতটা প্রতিশ্রুতি পূরণ করে, সেদিকে নজর রয়েছে। তবে সেটা বোঝার জন্য আরো কিছুটা সময় লাগে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থনীতিবিদ শুভনীল চৌধুরী ডিডাব্লিউকে বলেন, “অন্নপূর্ণা যোজনায় কত নারী আবেদন করবেন ও তাদের কতজনকে প্রকল্পের সুবিধা দেয়া হবে, সেটা এখন বলা সম্ভব নয়। এই প্রক্রিয়াটা শেষ হতে সময় লাগবে। তার আগে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা মুশকিল। তবে আগে যে প্রকল্প ইউনিভার্সাল ছিল, সেটা এবার টার্গেটেড হতে চলেছে। যদি রাজ্য সরকার অন্যান্য সব খাতে খরচ এক রেখে লক্ষ্মীর ভান্ডারের সব প্রাপককে অন্নপূর্ণা যোজনায় সুবিধা দিতে চায়, তাহলে এই খাতে খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। আগের প্রকল্পের ক্ষেত্রে ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হত রাজ্য সরকারের। এর দ্বিগুণ টাকার ব্যবস্থা রাজ্যকে করতে হবে। এটার মধ্যে অর্থনীতি যত না আছে, তার বদলে যে সরল পাটিগণিত আছে, সেটা বোঝা দরকার।”
শুধু নারী নয়, তরুণ থেকে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য চালু ভাতা দ্বিগুণ করার কথা রয়েছে। এছাড়াও আছে সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া মেটানোর চাপ।
শুভনীল বলেন, “সরকারের আর্থিক ক্ষমতা সীমিত। এই পরিস্থিতিতে এতগুলি প্রতিশ্রুতি একসঙ্গে পূরণ করা চ্যালেঞ্জের। সেই জায়গায় নতুন সরকার রেশনিং করার কথা ভাবছে। শেষমেশ অন্নপূর্ণা যোজনা কতজন পেলেন, সেই সংখ্যা না জানলে বোঝা সম্ভব নয় যে, অর্থনীতিতে এর প্রভাব কী পড়তে পারে। তবে একটা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবায়িত করতে গেলে কী সমস্যা হতে পারে, সেটা এখন বোঝা যাচ্ছে। সরকারি কর্মীদের ডিএ সংক্রান্ত ঘোষণা এখনো হয়নি। এর সঙ্গে রয়েছে সপ্তম বেতন কমিশন। এত কিছু একসঙ্গে বজায় রাখা সরকারের পক্ষে সত্যিই কঠিন।”
সর্বজনীন ভাতার রাজনীতি
সর্বজনীন প্রকল্পকে নির্দিষ্ট অংশের উপভোক্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেয়ার সরকারি উদ্যোগকে অনেকে স্বাগত জানাচ্ছেন।
দেবাঞ্জন বলেন, “যিনি ৭০ হাজার টাকা মাসে রোজগার করেন, তিনিও লক্ষ্মীর ভান্ডারের লাইনে দাঁড়িয়েছেন। এই লাইনেই দাঁড়িয়েছেন তার বাড়িতে যিনি রান্না করেন বা বাসন মাজেন। এটা তো অনৈতিক। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রকল্প চালু করে বিপুল জনসমর্থন আদায় করেছিলেন। কিন্তু, এতে তিনি মুড়ি-মিছরি এক করে দেন। বর্তমান সরকার এই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে সত্যিই যাদের প্রয়োজন, তাদের হাতে সরকারি অনুদান তুলে দিতে পারলে ভালো হয়।”
মমতা যে নারী সমাজকে ব্লক ভোটিংয়ের দিকে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন, তার উল্টো প্রভাব কি বিজেপির ওপরে পড়তে পারে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, “এর পরে পঞ্চায়েত, পুরসভা নির্বাচন হবে। অন্নপূর্ণা যোজনা যদি সবাইকে না দেয়া হয়, সেটা ভোটে প্রভাব ফেললে সরকার পিছু হঠতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তেও তারা যে চিন্তাভাবনা করেছে, সেটা ঠিক। যাদের বাড়িতে অনেক টাকা রোজগার, আয়কর দিতে হয়, যারা প্রান্তিক মানুষ নন, প্রান্তিক নারী নন, তাদের তো এই ভাতার দরকার নেই। এই ভাতা রাজনীতি যত কম হয়, ততই পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে মঙ্গল। সেই টাকাটা বাঁচিয়ে উন্নয়ন খাতে খরচ করা যাবে। প্রান্তিক নারী ছাড়া অন্যদের এই প্রকল্পের আওতা থেকে যদি বাদ দেয়া যায়, পশ্চিমবঙ্গকে ভাতা রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত করা যায়, তাহলে খুবই ভালো।”
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপরে জোর দিচ্ছেন অধ্যাপক ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, “নারীদের কেপেবিলিটি ডেভেলপমেন্ট বা সামর্থ্য বিকাশের ব্যবস্থা করা উচিত। অর্থাৎ সরকার কিছু ভাতা দেবে এবং সেটা তারা বাপের বাড়ি বা শ্বশুরবাড়িতে খরচ করবেন, তা নয়। তাদের একটা কম্পিউটার ট্রেনিং দেবে, ইংলিশ কোচিংয়ের ব্যবস্থা করবে, কিংবা অন্য কোনো প্রশিক্ষণ দেবে। এতে নারীরা দেড় হাজার টাকা নয়, নিজেরা রোজগার করে ঘরে বসে অন্তত দুই, আড়াই হাজার বা তার থেকে বেশি টাকা রোজগার করতে পারেন। অর্থাৎ, নারীর দরকার স্বনির্ভরতা। সেই জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার।”
ডিডাব্লিউ ডটকম
পায়েল সামন্ত ,কলকাতা 


















