আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে বড় ধরনের কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে চীন। সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসা এক চালান আপেল চীনের শেনজেন বন্দরে শুল্কমুক্ত সুবিধায় প্রবেশ করে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই চালান ছিল আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য চীনের সম্প্রসারিত শূন্য-শুল্ক নীতির আওতায় প্রবেশ করা প্রথম পণ্য।
চীনের এই নীতির আওতায় আফ্রিকার ৫৩টি দেশ সুবিধা পাচ্ছে। তবে একটি দেশ এই সুবিধার বাইরে রয়েছে। কারণ দেশটি এখনো তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাণিজ্যের পাশাপাশি কূটনৈতিক বার্তাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে বেইজিং।
আফ্রিকা নিয়ে বাড়ছে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা
বিশ্বায়নের গতি কমে আসার সময়ে চীনের এই একতরফা শুল্কমুক্ত উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আফ্রিকা এখন শুধু উন্নয়নশীল অঞ্চল নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরাও আফ্রিকার গুরুত্ব স্বীকার করছেন। তাদের মতে, চীন, রাশিয়া, সন্ত্রাসবাদ এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থার কারণে অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, গুরুত্ব স্বীকার করা হলেও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ এবং বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে।
সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা
আফ্রিকায় চীন ও রাশিয়ার তৎপরতা শুধু রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের প্রধান লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, বন্দর, অস্ত্রবাজার, সামরিক উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে সমর্থন নিশ্চিত করা।
২০২৫ সালে চীন-আফ্রিকা বাণিজ্যের পরিমাণ রেকর্ড ৩৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে আফ্রিকার জনসংখ্যা প্রায় ১৫০ কোটিতে পৌঁছেছে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তা ২৫০ কোটিতে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্বের কোবাল্ট উৎপাদনের বড় অংশ আসে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র থেকে। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও আধুনিক প্রযুক্তি শিল্পে ব্যবহৃত এই গুরুত্বপূর্ণ খনিজের অনেক বড় খনি চীনা মালিকানায় রয়েছে অথবা চীনের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। শুধু খনি নয়, কোবাল্ট পরিশোধনের ক্ষেত্রেও চীনের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী।

বন্দর ও সামরিক উপস্থিতি
আফ্রিকার বাণিজ্যিক বন্দরগুলোতেও চীনের উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে। মহাদেশটির শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এর মধ্যে জিবুতির গুরুত্বপূর্ণ বন্দর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যার পাশেই চীনের প্রথম বিদেশি সামরিক ঘাঁটি অবস্থিত।
অন্যদিকে রাশিয়া মূলত অস্ত্র বিক্রি এবং খনিজ সম্পদকে কেন্দ্র করে আফ্রিকায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি আফ্রিকার অন্যতম প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে আফ্রিকার স্বর্ণসম্পদ থেকেও বড় অঙ্কের আয় করছে মস্কো।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, আফ্রিকায় চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমছে। বিশেষ করে গোয়েন্দা কার্যক্রম ও কৌশলগত বিনিয়োগে বাজেট সংকোচনের কারণে ওয়াশিংটনের প্রভাব আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ফলে আফ্রিকা এখন শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাবনার মহাদেশ নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। আর এই প্রতিযোগিতায় চীন বর্তমানে সবচেয়ে দৃশ্যমান ও সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















