দেশে মে মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। একই সময়ে গণপিটুনি ও জনতার সহিংসতায় ৩১ জন নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮৩ নারী ও শিশু, যাদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা ঘটনা ঘটেছে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
গণপিটুনি ও জনতার সহিংসতায় প্রাণহানি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসে ৬৬টি গণপিটুনি ও জনতার সহিংসতার ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ৬৮ জন আহত হন। বিভিন্ন এলাকায় গুজব, চুরির অভিযোগ ও অন্যান্য সন্দেহকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটে।
কিছু ঘটনায় নির্যাতনের পর হত্যার অভিযোগও উঠে এসেছে। মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য এসব ঘটনাকে বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া গত মাসে ২৮টি অজ্ঞাত পরিচয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়।
রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৫
মে মাসে অন্তত ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থক ও একজন সাধারণ নারী রয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধ এসব সহিংসতার প্রধান কারণ। আগের মাসের তুলনায় ঘটনার সংখ্যা কিছুটা কমলেও প্রাণহানির বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা
মে মাসে অন্তত ৩০৫ নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮৩ জন ধর্ষণের শিকার হন। ধর্ষণের পর ছয়জনকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের মধ্যে চারজন শিশু।
এছাড়া ৭৬ নারী ও কিশোরী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪২ জনই শিশু। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ
মানবাধিকার পরিস্থিতির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গত তিন মাসে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গ এবং চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে সারা দেশে ৬০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া রাজধানীর একটি হাসপাতালে একদিনে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সীমান্তে মৃত্যু ও গ্রেপ্তার
মে মাসে সীমান্ত এলাকায় চার বাংলাদেশি নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তিনজন স্থানীয় বাসিন্দার মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত এক হাজার ৯৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা-হয়রানি
মে মাসে ৩৯টি ঘটনায় অন্তত ৭৮ জন সাংবাদিক হামলা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪২ জন আহত, ১৮ জন শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত এবং নয়জন হুমকির মুখে পড়েন। একজন সাংবাদিককে আটকও করা হয়।
প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার আহ্বান
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও মানবিক অগ্রগতির স্বার্থে জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















