যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বকে সাধারণত পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়। এসব কারণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেবল এই দৃশ্যমান ইস্যুগুলোর মধ্যে আটকে থাকলে পুরো ছবিটি দেখা যায় না। কারণ দুই দেশের সম্পর্কের জটিলতার পেছনে আরও একটি গভীর কারণ কাজ করেছে—তারা আলোচনাকে একইভাবে বোঝে না। একপক্ষ যে প্রক্রিয়াকে কার্যকর দরকষাকষি মনে করে, অন্যপক্ষ সেটিকেই অবিশ্বাস বা অগ্রহণযোগ্য চাপ হিসেবে দেখে।
দীর্ঘ অচলাবস্থার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ওয়াশিংটন ও তেহরান শুধু শর্ত নিয়ে দ্বিমত করেনি; তারা আলোচনা বা সমঝোতার প্রকৃতি নিয়েই ভিন্ন ধারণা পোষণ করেছে। ফলে বহুবার আলোচনার টেবিলে বসেও উভয় পক্ষ একে অপরের উদ্দেশ্য সঠিকভাবে বুঝতে পারেনি।
এই পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক-ধাঁচের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ইরানের রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কূটনৈতিক ঐতিহ্যের তুলনায়। মার্কিন রাজনৈতিক চিন্তায় প্রায়ই আলোচনাকে একটি নির্দিষ্ট ফল অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। সেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত, দৃশ্যমান সাফল্য এবং স্পষ্ট চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। আলোচনার মূল্য নির্ধারিত হয় ফলাফলের মাধ্যমে।
অন্যদিকে ইরানি কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা কেবল কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর উপায় নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রের মর্যাদা, ঐতিহাসিক পরিচয় এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে সেখানে সিদ্ধান্ত গড়ে ওঠে। ফলে তাত্ক্ষণিক সমঝোতার চেয়ে অবস্থান ধরে রাখা এবং কৌশলগত সুবিধা সংরক্ষণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সমস্যা তৈরি হয় সময় সম্পর্কে দুই পক্ষের ধারণায়। মার্কিন নীতিনির্ধারণে সময় প্রায়ই একটি চাপ। নির্বাচনী রাজনীতি, সংবাদচক্র এবং প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে দ্রুত ফল দেখানোর তাগিদ থাকে। ফলে দীর্ঘসূত্রতা সেখানে অগ্রগতির অভাব হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ধৈর্য নিজেই একটি কৌশল। সময়কে ব্যবহার করা হয় প্রতিপক্ষের অবস্থান যাচাইয়ের জন্য। দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে চাপ সহ্য করার সক্ষমতা প্রদর্শনও সেখানে একটি রাজনৈতিক বার্তা। ফলে যা তেহরানের কাছে স্বাভাবিক কৌশল, ওয়াশিংটনের কাছে তা অনেক সময় অনীহা বা গড়িমসি বলে মনে হয়।
একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র যখন কঠোর নিষেধাজ্ঞা, সর্বোচ্চ চাপ বা কঠিন শর্তের মাধ্যমে দ্রুত অগ্রগতি আদায়ের চেষ্টা করে, তখন সেটি আমেরিকার দৃষ্টিতে দরকষাকষির অংশ হতে পারে। কিন্তু ইরান প্রায়ই এসব পদক্ষেপকে আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করে। ফলে উভয় পক্ষই একে অপরের আচরণের ভুল অর্থ দাঁড় করায়।
এখানেই মূল সংকট। যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় এমন একটি চূড়ান্ত সমঝোতা চায়, যা স্পষ্টভাবে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা যায়। অন্যদিকে ইরান এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো খোঁজে, যেখানে সম্পর্ক পুরোপুরি নিষ্পত্তি না হলেও পারস্পরিক স্বার্থ ও প্রভাবের ভারসাম্য বজায় থাকে। একপক্ষ চায় একটি নির্দিষ্ট গন্তব্য, অন্যপক্ষ বেশি গুরুত্ব দেয় চলমান প্রক্রিয়াকে।
অবশ্য কূটনৈতিক দর্শনের এই পার্থক্যই একমাত্র বাধা নয়। দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আদর্শগত অবস্থান, কংগ্রেস ও ধর্মীয়-রাজনৈতিক শক্তির চাপ, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ—সবই সমঝোতার পথে প্রভাব ফেলে। তবু আলোচনার ভাষা ও পদ্ধতি নিয়ে মৌলিক বিভেদ দূর না হলে নতুন কোনো চুক্তিও দীর্ঘস্থায়ী হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস দেখিয়েছে, কেবল শক্তির ভারসাম্য দিয়ে সব সংকটের সমাধান হয় না। কখনও কখনও সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় পারস্পরিক উপলব্ধির ঘাটতি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে। উভয় দেশ যদি ভবিষ্যতে স্থায়ী শান্তি বা কার্যকর সমঝোতা চায়, তাহলে তাদের শুধু শর্ত নয়, আলোচনার দর্শন সম্পর্কেও নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ একই টেবিলে বসা যথেষ্ট নয়; একই ভাষায় আলোচনা করাও জরুরি।
Sarakhon Report 


















