রাজনীতিকে বোঝার জন্য মানুষ সাধারণত কিছু সহজ শব্দ খোঁজে। ‘বাম’ ও ‘ডান’ সেই ধরনেরই দুটি শব্দ, যা বহু দেশে রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক দর্শন এবং সামাজিক মূল্যবোধ ব্যাখ্যার জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সব দেশের বাস্তবতা কি একই ছকে ফেলা যায়? দক্ষিণ কোরিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
সিউলের অলিম্পিক পার্কে নির্বাচন-সংক্রান্ত বিতর্ক ঘিরে যে বিক্ষোভ চলছে, সেখানে অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন ‘বামও নই, ডানও নই’ বলে। অনেকেই এটিকে তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রকাশ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু বিষয়টি সম্ভবত আরও গভীর। এটি হয়তো এমন একটি বাস্তবতার প্রতিফলন, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রচলিত ভাষা এখনও পুরোপুরি ধরতে পারেনি।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতিকে দীর্ঘদিন ধরে প্রগতিশীল বনাম রক্ষণশীল, বা বাম বনাম ডান—এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেশটির রাজনৈতিক বিভাজনের শিকড় আদর্শগত সংঘাতে যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও সামাজিক জোটের মধ্যে নিহিত।
গণতন্ত্র বনাম কর্তৃত্ববাদের যুগ
আজকের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্ম এমন এক সময়ে, যখন কোরিয়া সামরিক প্রভাবাধীন শাসনব্যবস্থা থেকে গণতন্ত্রের পথে এগোচ্ছিল। তখন রাজনীতির মূল প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্রের চরিত্র। একদিকে ছিল এমন একটি শাসকগোষ্ঠী, যারা জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং উত্তর কোরিয়ার হুমকিকে সামনে রেখে নিজেদের ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করত। অন্যদিকে ছিল গণতন্ত্রকামী বিরোধী শক্তি, যারা মনে করত রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারই দেশের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
এটি ছিল প্রকৃত অর্থেই মূল্যবোধের সংঘাত। রাষ্ট্র কোন পথে যাবে, নাগরিকের ভূমিকা কী হবে, ক্ষমতার জবাবদিহি কতটা থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য ছিল।
একই সময়ে আরেকটি বিভাজনও রাজনীতিকে প্রভাবিত করত—আঞ্চলিক পরিচয়। দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরেও প্রভাব ফেলেছিল। ফলে গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোও একক নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি।
কিন্তু সেই বাস্তবতা এখন অনেকটাই বদলে গেছে।

পুরোনো কাঠামোর অবসান
দক্ষিণ কোরিয়ায় আর সামরিক শাসন নেই। গণতন্ত্র এখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত ভিত্তি। যদিও রাজনৈতিক বিতর্কে মাঝে মাঝে কিছু পক্ষকে অতীতের কর্তৃত্ববাদী ধারার উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরা হয়, বাস্তবে কোনো প্রধান রাজনৈতিক শক্তিই সামরিক শাসন বা স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চায় না।
আঞ্চলিক ভোটব্যাংকের প্রভাবও আগের তুলনায় অনেক কমেছে। নির্বাচনের ফলাফলে অঞ্চল এখনও কিছু ভূমিকা রাখে, কিন্তু তা আর রাজনীতির প্রধান ব্যাখ্যা নয়।
তবু রাজনৈতিক শিবির দুটি রয়ে গেছে। সমস্যা হলো, আমরা ধীরে ধীরে এই ঐতিহাসিক জোটগুলোকে আদর্শগত ব্লক হিসেবে দেখতে শুরু করেছি। একটিকে ‘প্রগতিশীল বাম’ এবং অন্যটিকে ‘রক্ষণশীল ডান’ বলা হয়েছে। অথচ বাস্তবে এই পরিচয়গুলো প্রায়ই বিভ্রান্তিকর।
কারণ দুই পক্ষই প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে সমর্থন করে, আবার সুবিধামতো বাজার অর্থনীতির পক্ষেও অবস্থান নেয়। উভয় পক্ষই জাতীয়তাবাদী ভাষা ব্যবহার করে, নিজেদের সমর্থক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে এবং সংস্কারের কথা বললেও প্রায়ই নিজেদের ক্ষমতার ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এমন পরিবর্তনের বিরোধিতা করে।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, যদি তাদের নীতি ও আচরণ এতটাই মিশ্র হয়, তবে ‘বাম’ ও ‘ডান’ শব্দ দুটি এখনও কেন টিকে আছে?
আসলে বিকল্প ভাষার অভাবই এর একটি বড় কারণ।
ভাষার সীমাবদ্ধতা, বিশ্লেষণের সংকট
রাজনীতিকে বাম-ডানের ফ্রেমে দেখার একটি বড় সমস্যা হলো এটি চিন্তাকে সংকুচিত করে। কোনো ধারণা বা নীতির গুণাগুণ বিচার করার পরিবর্তে মানুষ আগে দেখে সেটি কোন শিবিরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে পরিচয়, যুক্তি নয়।
এমনকি কোনো একটি অবস্থান সম্পর্কে কৌতূহল প্রকাশ করাও কখনও কখনও রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগ ডেকে আনে। এতে মুক্ত আলোচনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ দুর্বল হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক নির্বাচন-সংক্রান্ত বিতর্কও তার একটি উদাহরণ। প্রশাসনিক ত্রুটি বা ভোট ব্যবস্থাপনা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোকে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের রাজনৈতিক উৎসের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে অভিযোগকারী কোন শিবিরের মানুষ।
গণতন্ত্রের জন্য নতুন চিন্তা
একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক পরিচয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন পরিচয় যুক্তির বিকল্প হয়ে যায়, তখন গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নাগরিকদের উচিত প্রতিটি নীতি, প্রতিটি দাবি এবং প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থানকে তার প্রমাণ, কার্যকারিতা ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে বিচার করা।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিক্ষোভকারীরা যখন নিজেদের ‘বাম’ বা ‘ডান’ কোনো পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করতে অস্বীকার করছেন, তখন তারা হয়তো শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার ঘোষণা দিচ্ছেন না; তারা বিদ্যমান রাজনৈতিক ভাষার সীমাবদ্ধতাকেও চ্যালেঞ্জ করছেন।
সম্ভবত সময় এসেছে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার, যেখানে ধারণার মূল্য নির্ধারিত হবে তার শক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে, কোনো ঐতিহাসিক শিবিরের উত্তরাধিকার দিয়ে নয়। আর সেই পরিবর্তনের প্রথম শর্ত হতে পারে—পুরোনো অভিধানের বাইরে নতুন রাজনৈতিক ভাষা খুঁজে পাওয়া।
মাইকেল ব্রিন 


















