যুক্তরাষ্ট্র যদি আগামী ২৫ বছরেও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি ও সামরিক শক্তি ধরে রাখতে না পারে, তাহলে মার্কিন ডলার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রার মর্যাদা হারাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জেপি মরগান চেজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেমি ডিমন।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ডিমন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়লে বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ব আরও বিভক্ত ও অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ডলারের আধিপত্য এখনো শক্তিশালী
বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের অবস্থান এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় ৫৭ শতাংশই ডলারে রাখা হয়। তবে শতাব্দীর শুরুতে এই হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে ডলারের অংশীদারত্ব কমেছে, যদিও এখনো এর বিকল্প হিসেবে কোনো একক মুদ্রা ডলারের সমপর্যায়ের অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
রাশিয়া ইউক্রেনে অভিযান শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল সম্পদ জব্দ করায় ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। অনেক দেশ আশঙ্কা করতে থাকে, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নিষেধাজ্ঞার ক্ষমতা অন্য দেশগুলোকে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে উৎসাহিত করতে পারে।

তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষণায় ২০২২ সালের পর ডলারভিত্তিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সরে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
চীনের ওপর নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ
ডিমনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য শুধু বড় অর্থনীতি থাকা যথেষ্ট নয়। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য উৎপাদনেও দেশটির সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অনেক গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিরল খনিজ, অ্যালুমিনিয়াম, নির্দিষ্ট ধরনের ইস্পাত এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্প সরঞ্জামের মতো পণ্যের সরবরাহে বিদেশি নির্ভরতা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ডিমনের ভাষ্য, এই বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের এক দশক বা দেড় দশক আগেই উপলব্ধি করা উচিত ছিল। এখন দেশটির নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা দেশের ভেতরে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন
ইরানের যুদ্ধকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে ডিমন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বড় যুদ্ধ চললে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় উৎপাদন সক্ষমতা পর্যাপ্ত কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
তার এই মন্তব্যের মূল বিষয় হলো—সামরিক শক্তি শুধু উন্নত অস্ত্র বা বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর নির্ভর করে না। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় শিল্প উৎপাদন, জ্বালানি, কাঁচামাল, প্রযুক্তি এবং সরবরাহব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
১ দশকে দেড় ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্যোগ
এই ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় গত বছর জেপি মরগান ১০ বছরের জন্য ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের একটি নিরাপত্তা ও স্থিতিস্থাপকতা উদ্যোগ ঘোষণা করে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, উন্নত উৎপাদন, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তির মতো কৌশলগত খাতকে এর আওতায় রাখা হয়েছে।
ডিমনের মতে, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, পণ্য ও উৎপাদন ব্যবস্থায় অনির্ভরযোগ্য বিদেশি উৎসের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত নির্ভরতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ডলারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতার ওপর
ডিমনের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতা—কোনো দেশের মুদ্রার বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা শুধু আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না। এর পেছনে অর্থনৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই যুক্তরাষ্ট্র যদি এসব ক্ষেত্রে তার দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারে, তাহলে ডলারের আধিপত্যও শক্তিশালী থাকবে। কিন্তু অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতায় বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা দিলে বিশ্বের দেশগুলো বিকল্প মুদ্রা ও আর্থিক ব্যবস্থার দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে পারে।
ডিমনের আশঙ্কা, এমন পরিস্থিতি শুধু ডলারের অবস্থানকেই দুর্বল করবে না; বরং বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও খণ্ডিত করে তুলতে পারে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















