মাঠে জয় আসেনি, কিন্তু সমর্থকদের আবেগে কোনো ভাটা পড়েনি। মৌসুমের প্রথম তাপপ্রবাহের মধ্যেও দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় ফুটবল দলের সমর্থনে রাজধানী সিউলের কেন্দ্রস্থল ভরে ওঠে লাল পোশাক পরা হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচ দেখতে এবং দলকে উৎসাহ দিতে শুক্রবার সকাল থেকেই নগরজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
সিউলের ঐতিহাসিক গওয়াংহওয়ামুন স্কয়ারে সকাল থেকেই সমর্থকদের ঢল নামে। স্থানীয় প্রশাসনের হিসাবে, ম্যাচ চলাকালে সেখানে প্রায় ১৮ হাজার মানুষ জড়ো হন। তীব্র রোদ ও ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপেক্ষা করে তারা জাতীয় দলের সমর্থনে স্লোগান দেন এবং ম্যাচ উপভোগ করেন।
গরমের মধ্যেও উৎসবের আমেজ
ম্যাচটি ছিল কর্মদিবসের সকালে। তবু অফিসপাড়ার পরিবেশ যেন বদলে যায় এক ফুটবল উৎসবে। কেউ অফিস থেকে বিরতি নিয়ে, কেউ পরিবার নিয়ে, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে স্কয়ারে হাজির হন। হাতে পাখা, ছাতা, টুপি কিংবা ঠান্ডা রাখার বিশেষ প্যাচ ব্যবহার করেও তারা দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন।
মাঠে কোরিয়া যখনই আক্রমণে উঠেছে, সমর্থকদের উল্লাসে মুখর হয়েছে পুরো এলাকা। গোলের সুযোগ হাতছাড়া হলে হতাশার দীর্ঘশ্বাস শোনা গেলেও মুহূর্তের মধ্যে আবার শুরু হয়েছে নতুন উদ্দীপনায় সমর্থনের স্লোগান।
শেষ পর্যন্ত গোলের দেখা মেলেনি
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে কোরিয়ার কোচ একাধিক পরিবর্তন এনে ম্যাচের মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করেন। তারকা খেলোয়াড়দের বদলি নামানোয় সমর্থকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী মেক্সিকোর রক্ষণ ভাঙতে পারেনি কোরিয়া। প্রতিযোগিতার অন্যতম শক্তিশালী দল মেক্সিকোর কাছে ১-০ গোলে হার মানতে হয় তাদের।
তবু সমর্থকদের প্রতিক্রিয়ায় হতাশার চেয়ে গর্বই বেশি ছিল। অনেকেই মনে করেন, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দল সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে এবং খেলোয়াড়দের লড়াকু মানসিকতা প্রশংসার দাবি রাখে।
শুধু স্কয়ার নয়, শহরজুড়ে সমর্থনের জোয়ার
গওয়াংহওয়ামুনের বাইরে সিউলের আরও কয়েকটি এলাকায় বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হয়। আর্থিক জেলা, বাণিজ্যিক এলাকা এবং জনপ্রিয় সড়কগুলোতেও শত শত মানুষ একসঙ্গে ম্যাচ উপভোগ করেন। বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকানও পরিণত হয় অস্থায়ী দর্শককেন্দ্রে।
বিশেষ করে মধ্যাহ্নভোজের সময় অফিসকর্মীদের উপস্থিতিতে এসব স্থান জমজমাট হয়ে ওঠে। ফলে পুরো শহরজুড়েই ফুটবল ঘিরে এক ধরনের ঐক্যবদ্ধ আবহ তৈরি হয়।

ভিন্ন দেশের সমর্থকদের মিলনমেলা
লাল জার্সিধারী কোরীয় সমর্থকদের ভিড়ের মধ্যেই চোখে পড়ে সবুজ পোশাক পরা মেক্সিকান সমর্থকদের। তারা নিজেদের দলকে সমর্থন করতে এলেও পুরো আয়োজনকে দুই সংস্কৃতির মিলনমেলা হিসেবে দেখেছেন।
মেক্সিকান ও কোরীয় সমর্থকদের একসঙ্গে ছবি তোলা, হাসি-আড্ডা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ অনেকের নজর কাড়ে। বিদেশি শিক্ষার্থী ও প্রবাসীরাও এই অনন্য অভিজ্ঞতার অংশ হন। কেউ কোরিয়ার জার্সি পরে স্থানীয় সমর্থকদের সঙ্গে মিশে যান, আবার কেউ দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশের প্রশংসা করেন।
নতুন প্রজন্মের জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা
অনেক শিশুর জন্য এটি ছিল প্রথমবারের মতো রাস্তায় নেমে জাতীয় দলকে সমর্থন করার অভিজ্ঞতা। পরিবারের সদস্যরা জানান, অতীতের ঐতিহাসিক ফুটবল মুহূর্তের আবহ নতুন প্রজন্মকে অনুভব করানোর লক্ষ্যেই তারা সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে এসেছেন।
নিরাপত্তায় ছিল বিশেষ ব্যবস্থা
প্রচণ্ড গরমে সমর্থকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন পানীয় জল সরবরাহ, চিকিৎসাকর্মী মোতায়েন এবং জরুরি সেবার ব্যবস্থা রাখে। ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও সম্ভাব্য দুর্ঘটনা মোকাবিলায় বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করেন।
মেক্সিকোর কাছে হারলেও কোরিয়ার ফুটবলপ্রেম যে এখনো অটুট, শুক্রবারের এই দৃশ্য তারই শক্ত প্রমাণ হয়ে থাকল। আগামী ২৬ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে দলের জন্য নতুন আশার অপেক্ষায় রয়েছেন সমর্থকেরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















