মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বেড়েছে। সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত শান্তি আলোচনা বাতিল হওয়া এবং একই সময়ে লেবাননে হামলা জোরদার করায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ফিরে এসেছে।
শুক্রবার গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫১ সেন্ট বা ০ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়ে ৮০ দশমিক ৩৬ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের জুলাই চুক্তির দাম ১ দশমিক ২৮ ডলার বা ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৭৭ দশমিক ৮৮ ডলারে। তবে উভয় সূচকই সাপ্তাহিক হিসাবে প্রায় ৮ শতাংশ ক্ষতির পথে রয়েছে।
শান্তি আলোচনা ঘিরে নতুন অনিশ্চয়তা
সুইজারল্যান্ড জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত অবসানে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে শুক্রবার যে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, তা আর অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। একই সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও তার নির্ধারিত সফর বাতিল করেছেন।
এই পরিস্থিতি বাজারে নতুন করে সংশয় তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক সমঝোতায় ইতোমধ্যে ফাটল দেখা যাচ্ছে, ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
তেলবাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভান্ডা ইনসাইটসের প্রতিষ্ঠাতা বন্দনা হরি বলেন, বাজার এখন এমন কোনো ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখছে না, যা হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌপরিবহন পুনরায় শুরু হওয়ার বিষয়ে আস্থা তৈরি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ও সরবরাহ পরিস্থিতি
বৃহস্পতিবার তেলের দাম মার্চের শুরুর পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। এর কারণ ছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির পর কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করা।
এসব জাহাজের মধ্যে সৌদি আরবের পতাকাবাহী তিনটি ট্যাংকার ছিল, যেগুলো প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করছিল।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে থাকা ৮ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল ধীরে ধীরে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ করতে পারে। পাশাপাশি ইরানের তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ আরও বৃদ্ধি পাবে।
বাজারের অপেক্ষা
কেসিএম ট্রেডিংয়ের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, ব্যবসায়ীরা এখনও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে—এমন দৃঢ় প্রমাণের অপেক্ষায় রয়েছেন। সেই নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত বাজার বড় ধরনের মূল্যপতনের দিকে এগোবে না।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হতো। চুক্তি কার্যকর থাকলে আগামী কয়েক মাসে বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রপ্তানি পুনরুদ্ধারের প্রস্তুতি
মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি তেল উৎপাদনকারী দেশ ইতোমধ্যে রপ্তানি স্বাভাবিক করার প্রস্তুতি শুরু করেছে। কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন যুদ্ধকালীন জারি করা সব ফোর্স মেজর নোটিশ প্রত্যাহার করেছে। অন্যদিকে ইরাকের তেলমন্ত্রী বাসিম মোহাম্মদ জানিয়েছেন, দেশটির তেলক্ষেত্রগুলো পুনরায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত এবং ধীরে ধীরে আগের উৎপাদন পর্যায়ে ফিরে যাবে।
তবে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও অস্থির। ফলে মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে বাজারে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তায় আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও তেলের দাম বেড়েছে। হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির দিকে নজর বাজারের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















