ভারতের অর্থনীতি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, নতুন নতুন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগোষ্ঠী দেশটির প্রবৃদ্ধির গল্পকে আরও শক্তিশালী করছে। কোটি কোটি নতুন বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে আসছেন, আর বড় বড় কোম্পানিগুলো নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে একটি পুরোনো সমস্যা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—করপোরেট শাসনের দুর্বলতা।
ভারতের অন্যতম বড় টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জিওর সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যে অংশীদার হতে আগ্রহী। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কতটা একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত।
পারিবারিক ব্যবসার আধিপত্য
ভারতের অর্থনীতির বড় অংশ এখনো পারিবারিক নিয়ন্ত্রণাধীন শিল্পগোষ্ঠীগুলোর হাতে। দেশের শীর্ষস্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাতা বা পরিবারের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে পরিবারের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতার অভাব দেখা যায়।
![]()
বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে নেতৃত্বের উত্তরাধিকার, পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে নতুন প্রজন্ম নেতৃত্বে এলেও প্রকৃত ক্ষমতা এখনো প্রতিষ্ঠাতা বা পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের হাতেই কেন্দ্রীভূত।
সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ
গত কয়েক বছরে ভারতে খুচরা বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। লক্ষ লক্ষ নতুন বিনিয়োগকারী নিজেদের সঞ্চয় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করছেন। কিন্তু এসব বিনিয়োগকারীর অধিকাংশেরই করপোরেট সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ খুব সীমিত।
যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে একটি পরিবার বা গোষ্ঠীর আধিপত্য থাকে, তখন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত অনেক সময় সব শেয়ারহোল্ডারের স্বার্থের বদলে পরিবারের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। এতে সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকির মুখে পড়েন।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাধা
ভারত নিজেকে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে তুলে ধরছে। দেশটি আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ, গভীরতর পুঁজিবাজার এবং শেয়ারভিত্তিক বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায়। কিন্তু দুর্বল করপোরেট শাসন এই লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শক্তিশালী পরিচালন কাঠামোকে গুরুত্ব দেন। যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অতিরিক্তভাবে একটি পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তখন বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের করপোরেট খাতে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরিয়ে আনতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীন ও কার্যকর পরিচালনা পর্ষদ গঠন, স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেনের ওপর কঠোর নজরদারি, ঋণ ও মালিকানা কাঠামো সম্পর্কে আরও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং উত্তরাধিকার পরিকল্পনায় স্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন।
এ ছাড়া সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার সুরক্ষায় আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরও শুধু বাজারের উত্থান উপভোগ না করে করপোরেট জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গল্প নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। তবে সেই প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি করপোরেট শাসনের মানও উন্নত করতে হবে। অন্যথায় শেয়ারবাজারের উচ্ছ্বাসের মাঝেও বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট থেকে যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















