বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্রুত এগিয়ে চলেছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, নাকি সরকার? যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে তীব্র দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসন অ্যানথ্রপিকের নতুন প্রজন্মের এআই মডেল ব্যবহারে একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে প্রতিষ্ঠানটিকে বিদেশি নাগরিকদের জন্য কিছু উন্নত মডেলের প্রবেশাধিকার সীমিত করতে বলা হয়েছে। এর ফলে প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের বিতর্ক শুরু হয়েছে।
উত্থানের গল্প
মাত্র ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত অ্যানথ্রপিকের জন্ম হয় নিরাপদ এআই তৈরির লক্ষ্য নিয়ে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতারা মনে করতেন, দ্রুতগতিতে এআই উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও নৈতিকতার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
শুরুতে প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে। সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য চ্যাটবটের বাজারে সরাসরি প্রতিযোগিতায় না গিয়ে তারা করপোরেট গ্রাহকদের জন্য বিশেষায়িত সফটওয়্যার ও কোডিং সহকারী তৈরি করে। এই সিদ্ধান্তই তাদের দ্রুত প্রবৃদ্ধির পথ তৈরি করে।
ব্যবসায়িক সাফল্যের নতুন মানদণ্ড
অ্যানথ্রপিকের কোডিং সহকারী প্রযুক্তি সফটওয়্যার উন্নয়নকারীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আয়ের বড় অংশই আসে ব্যবসায়িক গ্রাহকদের কাছ থেকে। এই মডেল তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বেশি স্থিতিশীল আয় নিশ্চিত করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাদের সম্ভাব্য বাজারমূল্য এক ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা শিগগিরই লাভজনক এআই প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইতিহাস গড়তে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।
নিরাপত্তা বনাম উদ্ভাবন
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই দীর্ঘদিন ধরে এআই নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন। তার মতে, এআই এমন এক প্রযুক্তি যা ভবিষ্যতে সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রধান উৎসে পরিণত হতে পারে। তাই এর উন্নয়নের পাশাপাশি কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড প্রয়োজন।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তাদের অগ্রাধিকার হলো চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে রাখা। ফলে তারা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা বিধিনিষেধকে অনেক সময় উদ্ভাবনের পথে বাধা হিসেবে দেখছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে জাতীয় নিরাপত্তা

সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকের উন্নত মডেলগুলোকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। প্রশাসনের কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, অত্যন্ত শক্তিশালী এআই মডেল হ্যাকিং, নজরদারি কিংবা অন্যান্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার প্রতিষ্ঠানটির ওপর অতিরিক্ত নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা শুরু করে। অ্যানথ্রপিকের দাবি, তারা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে এবং নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়েছে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে।
ভবিষ্যতের প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিরোধ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের সংঘাত নয়। এটি মূলত ভবিষ্যতের এআই শাসনব্যবস্থা কেমন হবে, সেই প্রশ্নের প্রতিফলন।
একদিকে রয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত উদ্ভাবনের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে সরকারের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন। নতুন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত এই টানাপোড়েন অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
এআই যত শক্তিশালী হবে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এর ওপর কার কতটা কর্তৃত্ব থাকবে। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতেই এখন অবস্থান করছে অ্যানথ্রপিক ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকার।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















