০৩:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
নিয়ন্ত্রণ নয়, রাজনৈতিক বাজি: ট্রাম্পের ইয়েন নীতির আসল হিসাব হাসিনার নির্দেশেই সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম, টিএফআই সেলে নির্যাতনের তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য মোদি-যোগী বৈঠকে ২০২৭ উত্তরপ্রদেশ নির্বাচন: অযোধ্যা, পরীক্ষার ফাঁস ও তরুণদের ক্ষোভে চাপে বিজেপি ইরান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন ট্রাম্পের শীর্ষ জেনারেল, বড় হামলা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনে উদ্বেগ ইরানের হামলায় হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে আগুন, ওমানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্তের পথে ভারতে ইউপিআই লেনদেন থাকবে বিনা খরচে, সীমিত ব্যবসায়িক পেমেন্টে বসতে পারে নামমাত্র ফি ‘ডিগ্রির কোনো মূল্য নেই’ ভারতে, তরুণদের ‘দুঃখ-তথ্য-সম্পদ’ নিয়ে রাহুল গান্ধীর বিস্ফোরক বক্তব্য চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপট, মানুষের চাকরি কি রোবটের দখলে যাচ্ছে? হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে: ইসলামী আন্দোলন নেতা পাকিস্তানে জামায়াতের দেশব্যাপী বিক্ষোভ, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি দামের প্রতিবাদে মহাসড়ক অবরোধ

শক্তির নতুন সমীকরণ: ইরান যুদ্ধ থাইল্যান্ডকে যে শিক্ষা দিল

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে তেলই ছিল প্রধান বিষয়। কিন্তু ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালির দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক অর্থনীতির জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি দ্রুত সামনে চলে এসেছে—তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি নির্ভরতা। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এই সংকট শুধু সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঘটনা নয়; এটি জ্বালানি রূপান্তরের কৌশলকে নতুন করে মূল্যায়নেরও সুযোগ তৈরি করেছে।

থাইল্যান্ড এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেশটি বহু বছর ধরে নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাসের মুখোমুখি। ফলে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের চাহিদা পূরণে তাকে ক্রমশ আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এই পরিবর্তন পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তিসঙ্গত হলেও সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা দেখিয়ে দিয়েছে যে এক ধরনের নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে আরেক ধরনের নির্ভরতায় আটকে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

ইরান যুদ্ধের সময় কাতারের এলএনজি রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়া এই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে কাতারের গ্যাসের বড় অংশই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে এশিয়ায় পৌঁছায়। যখন সেই সরবরাহ ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ে, তখন বাজারে শুধু জ্বালানির দাম বাড়েনি; সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

Australia Overtakes Qatar as World's Largest LNG Exporter

তবে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা দেখায় যে প্রস্তুতি থাকলে সংকট মোকাবিলা অসম্ভব নয়। দেশটি অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিল যে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানোর ওপর নির্ভর করবে না, বরং উৎসের বৈচিত্র্য এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করবে। সেই উপলব্ধি থেকেই তারা বিভিন্ন দেশ থেকে এলএনজি আমদানির ব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করে।

সংকটের সময় এই কৌশলের কার্যকারিতা স্পষ্ট হয়েছে। থাইল্যান্ড দ্রুত বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে, নতুন চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের সক্ষমতা ব্যবহার করেছে। অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বৃদ্ধি, এমনকি চীন থেকে পুনরায় রপ্তানিকৃত কার্গো সংগ্রহ—এসব পদক্ষেপ দেখায় যে নমনীয়তা এখন জ্বালানি নিরাপত্তার একটি অপরিহার্য উপাদান।

শুধু আমদানি উৎসের বৈচিত্র্যই নয়, থাইল্যান্ডের অবকাঠামোগত প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একাধিক এলএনজি টার্মিনাল, বিস্তৃত গ্রহণক্ষমতা এবং দীর্ঘদিনের ক্রয়-বিক্রয় অভিজ্ঞতা দেশটিকে সংকটের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় তারা একটি বেশি পরিণত ও অভিযোজনক্ষম গ্যাস বাজার গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। থাইল্যান্ডের বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি গ্যাসনির্ভর নয়। কয়লা, জলবিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং সীমান্তপারের বিদ্যুৎ আমদানির সমন্বিত ব্যবহার তাদের জন্য একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছে। ফলে এলএনজি সরবরাহে চাপ তৈরি হলেও পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়েনি।

Navigating the Unknown: Five Unanswered Questions About the Global Energy  Transition

এই অভিজ্ঞতা বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। দীর্ঘদিন ধরে এলএনজিকে এমন একটি ‘সেতুবন্ধন জ্বালানি’ হিসেবে দেখা হয়েছে, যা কয়লা বা অন্যান্য উচ্চ-কার্বন জ্বালানি থেকে অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন বিকল্পের দিকে যাওয়ার পথ তৈরি করে। সেই ধারণা এখনো অকার্যকর হয়ে যায়নি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু জ্বালানির ধরন পরিবর্তন করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। নিরাপত্তা নির্ভর করে সরবরাহ শৃঙ্খলের বৈচিত্র্য, অবকাঠামোর শক্তি এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর।

ইরান যুদ্ধ তাই মূলত একটি সতর্কবার্তা। এটি দেখিয়েছে যে জ্বালানি রূপান্তরের ভবিষ্যৎ শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে সমান গুরুত্ব নিয়ে ভাবতে হবে স্থিতিস্থাপকতা বা রেজিলিয়েন্স নিয়ে। ভবিষ্যতের জ্বালানি নীতিতে এই ধারণা কেন্দ্রীয় স্থান দখল করবে বলেই মনে হচ্ছে।

কারণ বর্তমান বিশ্বের ভূরাজনীতি যত অনিশ্চিত হচ্ছে, ততই পরিষ্কার হচ্ছে যে নিরাপদ জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে শুধু নতুন জ্বালানি নয়, নতুন ধরনের প্রস্তুতিও প্রয়োজন। আর সেই প্রস্তুতির মূল শব্দ হলো—বৈচিত্র্য, নমনীয়তা এবং স্থিতিস্থাপকতা। এগুলো ছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তার কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

নিয়ন্ত্রণ নয়, রাজনৈতিক বাজি: ট্রাম্পের ইয়েন নীতির আসল হিসাব

শক্তির নতুন সমীকরণ: ইরান যুদ্ধ থাইল্যান্ডকে যে শিক্ষা দিল

১১:৫৬:৩১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে তেলই ছিল প্রধান বিষয়। কিন্তু ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালির দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক অর্থনীতির জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি দ্রুত সামনে চলে এসেছে—তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি নির্ভরতা। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এই সংকট শুধু সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঘটনা নয়; এটি জ্বালানি রূপান্তরের কৌশলকে নতুন করে মূল্যায়নেরও সুযোগ তৈরি করেছে।

থাইল্যান্ড এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেশটি বহু বছর ধরে নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাসের মুখোমুখি। ফলে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের চাহিদা পূরণে তাকে ক্রমশ আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এই পরিবর্তন পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তিসঙ্গত হলেও সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা দেখিয়ে দিয়েছে যে এক ধরনের নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে আরেক ধরনের নির্ভরতায় আটকে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

ইরান যুদ্ধের সময় কাতারের এলএনজি রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়া এই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে কাতারের গ্যাসের বড় অংশই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে এশিয়ায় পৌঁছায়। যখন সেই সরবরাহ ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ে, তখন বাজারে শুধু জ্বালানির দাম বাড়েনি; সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

Australia Overtakes Qatar as World's Largest LNG Exporter

তবে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা দেখায় যে প্রস্তুতি থাকলে সংকট মোকাবিলা অসম্ভব নয়। দেশটি অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিল যে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানোর ওপর নির্ভর করবে না, বরং উৎসের বৈচিত্র্য এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করবে। সেই উপলব্ধি থেকেই তারা বিভিন্ন দেশ থেকে এলএনজি আমদানির ব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করে।

সংকটের সময় এই কৌশলের কার্যকারিতা স্পষ্ট হয়েছে। থাইল্যান্ড দ্রুত বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে, নতুন চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের সক্ষমতা ব্যবহার করেছে। অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বৃদ্ধি, এমনকি চীন থেকে পুনরায় রপ্তানিকৃত কার্গো সংগ্রহ—এসব পদক্ষেপ দেখায় যে নমনীয়তা এখন জ্বালানি নিরাপত্তার একটি অপরিহার্য উপাদান।

শুধু আমদানি উৎসের বৈচিত্র্যই নয়, থাইল্যান্ডের অবকাঠামোগত প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একাধিক এলএনজি টার্মিনাল, বিস্তৃত গ্রহণক্ষমতা এবং দীর্ঘদিনের ক্রয়-বিক্রয় অভিজ্ঞতা দেশটিকে সংকটের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় তারা একটি বেশি পরিণত ও অভিযোজনক্ষম গ্যাস বাজার গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। থাইল্যান্ডের বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি গ্যাসনির্ভর নয়। কয়লা, জলবিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং সীমান্তপারের বিদ্যুৎ আমদানির সমন্বিত ব্যবহার তাদের জন্য একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছে। ফলে এলএনজি সরবরাহে চাপ তৈরি হলেও পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়েনি।

Navigating the Unknown: Five Unanswered Questions About the Global Energy  Transition

এই অভিজ্ঞতা বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। দীর্ঘদিন ধরে এলএনজিকে এমন একটি ‘সেতুবন্ধন জ্বালানি’ হিসেবে দেখা হয়েছে, যা কয়লা বা অন্যান্য উচ্চ-কার্বন জ্বালানি থেকে অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন বিকল্পের দিকে যাওয়ার পথ তৈরি করে। সেই ধারণা এখনো অকার্যকর হয়ে যায়নি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু জ্বালানির ধরন পরিবর্তন করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। নিরাপত্তা নির্ভর করে সরবরাহ শৃঙ্খলের বৈচিত্র্য, অবকাঠামোর শক্তি এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর।

ইরান যুদ্ধ তাই মূলত একটি সতর্কবার্তা। এটি দেখিয়েছে যে জ্বালানি রূপান্তরের ভবিষ্যৎ শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে সমান গুরুত্ব নিয়ে ভাবতে হবে স্থিতিস্থাপকতা বা রেজিলিয়েন্স নিয়ে। ভবিষ্যতের জ্বালানি নীতিতে এই ধারণা কেন্দ্রীয় স্থান দখল করবে বলেই মনে হচ্ছে।

কারণ বর্তমান বিশ্বের ভূরাজনীতি যত অনিশ্চিত হচ্ছে, ততই পরিষ্কার হচ্ছে যে নিরাপদ জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে শুধু নতুন জ্বালানি নয়, নতুন ধরনের প্রস্তুতিও প্রয়োজন। আর সেই প্রস্তুতির মূল শব্দ হলো—বৈচিত্র্য, নমনীয়তা এবং স্থিতিস্থাপকতা। এগুলো ছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তার কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।