চীনের মধ্যবিত্ত সমাজে খাদ্যাভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এক সময় যেখানে প্রধান গুরুত্ব ছিল পর্যাপ্ত খাবার নিশ্চিত করা, সেখানে এখন মানুষ বেশি মনোযোগ দিচ্ছে খাবারের গুণগত মান, নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যগত উপকারিতার দিকে। প্রায় ৫০ কোটি মানুষের মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্রমেই স্বাস্থ্যকর, পরিচ্ছন্ন এবং প্রাকৃতিক খাবারের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে।
স্বাস্থ্য সচেতনতার নতুন ধারা
চীনে আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের খাদ্য তালিকায়ও পরিবর্তন এসেছে। ঐতিহ্যগতভাবে শূকরের মাংস জনপ্রিয় থাকলেও এখন মাছ, সামুদ্রিক খাদ্য, ফল এবং উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে স্যামন মাছ, ব্লুবেরি এবং অ্যাভোকাডোর মতো একসময় বিলাসী বলে বিবেচিত খাদ্যপণ্য এখন অনেক বেশি মানুষের নাগালে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্যের প্রতি আস্থার চাহিদাও এই পরিবর্তনের বড় কারণ।

খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
চীনে অতীতে একাধিক খাদ্য নিরাপত্তা কেলেঙ্কারি মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। দূষিত দুধের গুঁড়া থেকে শুরু করে নিম্নমানের রান্নার তেল ও প্রস্তুতকৃত খাবার নিয়ে বিতর্ক মানুষের মধ্যে খাদ্যের মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ফলে ক্রেতারা এখন শুধু খাবারের পরিমাণ নয়, বরং সেটি কোথা থেকে এসেছে এবং কীভাবে উৎপাদিত হয়েছে, সেদিকেও নজর দিচ্ছেন।
স্যামন ও বিদেশি খাদ্যের জনপ্রিয়তা
চীনের বাজারে স্যামন মাছের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্যামন বাজারে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে বড় আকারের খামারও গড়ে তোলা হচ্ছে।
একইভাবে ব্লুবেরি ও অ্যাভোকাডোর উৎপাদন ও ব্যবহারও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশ এসব ফল উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে দামও কমেছে, ফলে সাধারণ ভোক্তারাও এখন এসব ফল কিনতে পারছেন।
জৈব কৃষির প্রসার
চীনে জৈব কৃষির পরিধি গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জৈব কৃষিজমির পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে এবং জৈব খাদ্য বিক্রিও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আগে জৈব পণ্য সাধারণ পণ্যের তুলনায় অনেক বেশি দামে বিক্রি হলেও এখন উৎপাদন বাড়ার কারণে মূল্য ব্যবধান কমছে। বড় খুচরা বিক্রেতা ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোও জৈব পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলছে।
তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে
যদিও জৈব খাদ্যের জনপ্রিয়তা বাড়ছে, তবুও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অনেকের প্রশ্ন, পরিবেশ দূষণের ইতিহাস থাকা দেশে সব জৈব পণ্য সত্যিই কতটা বিশুদ্ধ। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের ব্যস্ত জীবনধারা এবং অনলাইন খাবার সরবরাহের ওপর নির্ভরশীলতা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বিস্তারে বাধা হতে পারে।
তবুও উদ্যোক্তারা মনে করছেন, স্বাস্থ্যকর খাবারকে আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করা গেলে এই বাজার আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হবে।
সরকারও এই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। স্থূলতা বৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। পর্যাপ্ত খাবার থেকে ভালো খাবারের দিকে এই যাত্রাই এখন চীনের খাদ্য সংস্কৃতির নতুন অধ্যায় হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















