ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে তাৎক্ষণিকভাবে দুর্বল না করে বরং আরও সংহত করেছে। তবে যুদ্ধের পর যে শান্তি ও সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, সেটিই এখন দেশটির ক্ষমতাকাঠামোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধকালীন ঐক্য ভেঙে ইরানের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে নতুন করে মতবিরোধ স্পষ্ট হচ্ছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর দেশটির রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি ইরান।
সমঝোতা নাকি প্রতিরোধ
বর্তমানে ইরানের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া নতুন সমঝোতা। এই চুক্তি কার্যকর হলে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হতে পারে এবং দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের আর্থিক প্রবাহ ফিরতে পারে।
পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, যুদ্ধের পর পুনর্গঠনের জন্য অর্থনৈতিক স্বস্তি অত্যন্ত জরুরি এবং এই চুক্তি সেই পথ খুলে দিতে পারে।
তবে ক্ষমতাসীন শিবিরের একটি বড় অংশ এ বিষয়ে একমত নয়। তারা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করা বিপজ্জনক এবং এই সমঝোতা ভবিষ্যতে নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে।
অর্থনীতির চাপে বাস্তববাদীদের উত্থান
বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ এবং তেলের আয় কমে যাওয়ার কারণে ইরানের অর্থনীতি ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং অবকাঠামো খাতেও নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে।
সরকার বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করলেও গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। অনেক নিরাপত্তা সংস্থাও পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে।
এই পরিস্থিতিতে বাস্তববাদী রাজনীতিকদের যুক্তি হলো, নতুন সংঘাত এড়াতে এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে আন্তর্জাতিক সমঝোতার বিকল্প খুব কম।

সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত
যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানে সামাজিক পরিবর্তনের কথাও আলোচনায় এসেছে। রাজধানী তেহরানের অনেক এলাকায় আগের তুলনায় সামাজিক বিধিনিষেধ শিথিল হয়েছে। নারীদের পোশাকবিধি প্রয়োগেও আগের মতো কঠোরতা দেখা যাচ্ছে না।
কিছু সংস্কারপন্থী গোষ্ঠী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক প্রভাব কমানো, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বিদেশে অবস্থানরত ভিন্নমতাবলম্বীদের দেশে ফেরার সুযোগ তৈরির মতো প্রস্তাবও সামনে এনেছে।
তবে এসব পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কঠোরপন্থীদের শক্ত অবস্থান
যুদ্ধে নিজেদের বিজয়ী মনে করা কঠোরপন্থী গোষ্ঠীগুলো এখনও রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতাকে সন্দেহের চোখে দেখছে এবং গালিবাফের মতো নেতাদের প্রকাশ্যে সমালোচনা করছে।

তাদের দাবি, ওয়াশিংটনের লক্ষ্য কেবল নিজের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা। তাই বর্তমান সমঝোতা দীর্ঘমেয়াদে ইরানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা
ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথ অনেকটাই নির্ভর করছে এমন কিছু নেতার ওপর, যারা এখনও জনসমক্ষে খুব কমই দেখা দিচ্ছেন। খামেনির উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
তবে আপাতত গালিবাফ ও তার সমর্থকরা রাজনৈতিক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। সাম্প্রতিক ভোটাভুটিতে তিনি বিপুল সমর্থন নিয়ে স্পিকারের পদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। একই সঙ্গে কিছু কঠোরপন্থী নেতার প্রভাবও কমতে শুরু করেছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং অর্থনৈতিক স্বস্তি এলে ইরানের নেতৃত্বকে শেষ পর্যন্ত বাস্তববাদী পথই বেছে নিতে হতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীন শিবিরের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও বাড়াবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















