২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের সময় অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন হয় ভেঙে পড়বে, নয়তো আরও ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোটে পরিণত হবে। এক দশক পর দেখা যাচ্ছে, কোনো ভবিষ্যদ্বাণীই পুরোপুরি সত্য হয়নি। তবে বাস্তবতা কিছুটা দ্বিতীয় দিকেই ঝুঁকেছে। যুক্তরাজ্যের বিদায়ের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভাঙেনি, বরং কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও একীভূতকরণ বেড়েছে।
আর কোনো দেশ বেরিয়ে যেতে চায়নি
ব্রেক্সিটের সমর্থকদের একটি বড় যুক্তি ছিল, যুক্তরাজ্যের পথ অনুসরণ করে অন্য দেশগুলোও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়বে। কিন্তু গত এক দশকে এমন কোনো প্রবণতা দেখা যায়নি। বরং ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ার দীর্ঘ ও জটিল আলোচনা ইউরোপের অন্যান্য দেশকে দেখিয়েছে, জোট ত্যাগ করা কতটা কঠিন এবং ব্যয়বহুল হতে পারে।
ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ নিয়ে অনিশ্চয়তা কমেছে এবং জোটের প্রতি আস্থা কিছুটা বেড়েছে।

অর্থনৈতিক একীকরণে নতুন ধাপ
ব্রেক্সিট-পরবর্তী সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে অর্থনৈতিক নীতিতে। ২০২০ সালে মহামারির ধাক্কা সামাল দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ইউরোর পুনরুদ্ধার তহবিল গঠন করে। এই তহবিলের অর্থ সংগ্রহ করা হয় ইউনিয়নের নামে যৌথ ঋণ নিয়ে, যা আগে কখনো এত বড় পরিসরে করা হয়নি।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাজ্য সদস্য থাকলে এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা কঠিন হতো। কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় আর্থিক ক্ষমতা বৃদ্ধির বিরোধিতা করেছিল।
বাণিজ্য ও শিল্পনীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
যুক্তরাজ্য ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী মুক্তবাণিজ্যপন্থী কণ্ঠগুলোর একটি। ব্রেক্সিটের পর সেই প্রভাব কমে যাওয়ায় ইউনিয়ন শিল্পনীতি ও অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপের দিকে বেশি ঝুঁকেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সদস্য দেশগুলোর জন্য শিল্প খাতে ভর্তুকি দেওয়ার সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর শুল্ক আরোপ এবং ইউরোপীয় উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিও গ্রহণ করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো কৌশলগত খাতে বাইরের দেশের ওপর নির্ভরতা কমানো।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিস্তার
প্রতিরক্ষা খাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। অতীতে ইউরোপীয় সামরিক উদ্যোগ নিয়ে যুক্তরাজ্যের আপত্তি ছিল প্রবল। তারা মনে করত, এসব উদ্যোগ ন্যাটোর গুরুত্ব কমাতে পারে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ে আরও সক্রিয় হয়েছে। ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়া থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা শিল্প সমন্বয়ের মতো উদ্যোগে জোটের ভূমিকা বেড়েছে। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় কমিশনে প্রতিরক্ষা বিষয়ক কমিশনার পদও যুক্ত করা হয়।
পরিবর্তনের পেছনে ব্রেক্সিট নয়, বৈশ্বিক সংকট
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরিবর্তনের মূল কারণ ব্রেক্সিট নয়। মহামারি, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং ইউরোপের নিরাপত্তা পরিবেশের পরিবর্তনই প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
তবে ব্রেক্সিট একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাজ্য অনুপস্থিত থাকায় এসব সংকট মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে সমাধানগুলো বেছে নিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা তুলনামূলক সহজ হয়েছে।
ব্রিটিশ প্রভাব পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি
মজার বিষয় হলো, যুক্তরাজ্যের কিছু পুরোনো অগ্রাধিকার এখনও টিকে আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্প্রসারণ, একক বাজারকে শক্তিশালী করা এবং নতুন বাণিজ্য চুক্তি করার মতো বিষয়গুলো এখনও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইউক্রেনসহ নতুন দেশগুলোর সদস্যপদের সম্ভাবনাও আগের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে।
ব্রেক্সিটের সবচেয়ে বড় প্রভাব কোথায়
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ব্রেক্সিটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আত্মবিশ্বাসে। দীর্ঘ বিচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় জোট ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়, যা পরবর্তী মহামারি ও ইউক্রেন সংকট মোকাবিলায় তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
এক দশক পরের চিত্র বলছে, ব্রেক্সিট ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ভেঙে দেয়নি। বরং নানা বৈশ্বিক সংকটের মুখে জোটটি আরও সমন্বিত, আত্মবিশ্বাসী এবং কিছু ক্ষেত্রে আরও কেন্দ্রাভিমুখী হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















