বিশ্বজুড়ে চকলেটের বাজারের আকার ১৪০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এই বিশাল শিল্পের মূল উপাদান কোকো বা কাকাও বীজের চাহিদা গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে। খারাপ আবহাওয়া ও দুর্বল ফলনের কারণে একসময় কোকোর দাম টনপ্রতি ১০ হাজার ডলারও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে উৎপাদন বাড়ানোর উপায় খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন কৃষক ও গবেষকেরা।
সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। কোকো গাছের পরাগায়নে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে এমন একদল ক্ষুদ্র রক্তচোষা পোকা, যাদের উপস্থিতি ছাড়া চকলেট উৎপাদনই বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
কোকো ফুলের অজানা সহায়ক
অনেক গাছপালা ফুলে পরাগ স্থানান্তরের জন্য মৌমাছি, প্রজাপতি বা অন্যান্য পোকামাকড়ের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু কোকো গাছের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রক্রিয়াটি রহস্যে ঢাকা ছিল। এর প্রধান কারণ কোকো ফুলের গঠন অত্যন্ত ছোট ও জটিল। ফুলের ভেতরে কী ঘটছে, তা সহজে পর্যবেক্ষণ করা যায় না।
![]()
গবেষকেরা মালয়েশিয়া ও ফরাসি গায়ানার কোকো খামারে সরাসরি পর্যবেক্ষণ চালান। শুধু ফুলে কত পোকা আসে তা গণনা না করে তারা ফুল খুলে ভেতরের কার্যকলাপও পরীক্ষা করেন। কোন পোকা ফুলের প্রজনন অংশের সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং তাদের শরীরে কোকোর পরাগ আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হয়।
গবেষণায় যা জানা গেল
পরীক্ষায় পিঁপড়া, মৌমাছি ও বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র মাছি পাওয়া গেলেও সংগ্রহ করা ৪৪৯টি পোকামাকড়ের মধ্যে ৪৩৯টিই ছিল মিজ নামে পরিচিত ক্ষুদ্র মাছি। এর মধ্যে ১৮৫টি ছিল রক্তচোষা মিজ, যাদের শরীরে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে কোকোর পরাগ পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, এই ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখায় যে কোকো গাছের পরাগায়নের প্রধান চালিকাশক্তি এই ক্ষুদ্র রক্তচোষা মিজ পোকাগুলো। অন্য পোকামাকড়ের মধ্যে কার্যকর পরাগায়নের তেমন প্রমাণ মেলেনি।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে শঙ্কা
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই মিজ পোকাগুলো শীতল ও আর্দ্র পরিবেশে বেশি সক্রিয় থাকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অনেক কোকো বাগান ধীরে ধীরে আরও উষ্ণ ও শুষ্ক হয়ে উঠছে।

এর ফলে ভবিষ্যতে কোকো উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদি পরাগায়নকারী পোকাগুলোর সংখ্যা কমে যায়, তাহলে ফলনও কমে যেতে পারে।
সমাধানের পথ কী?
গবেষকেরা মনে করছেন, কৃষিবনায়ন বা অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি পদ্ধতি একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। এ পদ্ধতিতে কোকো বাগানের মধ্যে স্থানীয় বড় গাছ লাগানো হয়, যা ছায়া দেয়, তাপমাত্রা কমায় এবং আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
এ ধরনের পরিবেশ মিজ পোকাদের জন্য অনুকূল আবাস তৈরি করতে পারে। ফলে পরাগায়ন বাড়বে এবং কোকো ফলনও উন্নত হতে পারে।
রক্তচোষা পোকাকে স্বাগত জানানো কৃষকদের জন্য হয়তো খুব সুখকর ধারণা নয়। তবে চকলেট উৎপাদন বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে এই ক্ষুদে পোকাগুলোর গুরুত্ব যে অনেক বেশি, তা এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















