অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের চিকিৎসায় একটি নতুন ওষুধ চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছে। ‘ডারাক্সনরাসিব’ নামের এই ওষুধের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। কারণ, এটি এমন এক ধরনের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কার্যকারিতা দেখিয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বেঁচে থাকার সময় প্রায় দ্বিগুণ
সাম্প্রতিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ডারাক্সনরাসিব ব্যবহার করা রোগীদের গড় বেঁচে থাকার সময় ৬ দশমিক ৭ মাস থেকে বেড়ে ১৩ দশমিক ২ মাসে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, রোগীরা প্রায় দ্বিগুণ সময় বেঁচে থাকতে পেরেছেন। যদিও এটি ক্যান্সারের সম্পূর্ণ নিরাময় নয়, তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্যান্য চিকিৎসার সঙ্গে ব্যবহার করলে এটি রোগীদের জন্য মূল্যবান অতিরিক্ত সময় এনে দিতে পারে।
অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার সাধারণত খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে এর লক্ষণ খুব কম দেখা যায়। ফলে অধিকাংশ রোগী তখনই শনাক্ত হন, যখন রোগটি শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে এক বছরের বেশি সময় বেঁচে থাকা রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
![]()
কীভাবে কাজ করে নতুন ওষুধ
ডারাক্সনরাসিব মূলত কেআরএএস নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনকে লক্ষ্য করে কাজ করে। এই প্রোটিনের পরিবর্তিত রূপ অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে। কেআরএএসের অস্বাভাবিক কার্যকলাপ টিউমারের চারপাশে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে শরীরের রোগপ্রতিরোধী কোষগুলো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না।
নতুন ওষুধটি কেআরএএসকে দমন করে। গবেষকদের ধারণা, এর ফলে টিউমারের চারপাশের পরিবেশও বদলাতে পারে, যা ভবিষ্যতে রোগপ্রতিরোধভিত্তিক চিকিৎসাকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।
শুধু অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার নয়
ডারাক্সনরাসিবের গুরুত্ব শুধু অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কেআরএএস কোষ বিভাজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আণবিক সুইচ হিসেবে কাজ করে। যখন এতে ত্রুটি দেখা দেয়, তখন কোষ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে থাকে, যা ক্যান্সারের মূল বৈশিষ্ট্য।
একই ধরনের জিনগত পরিবর্তন ফুসফুস, বৃহদান্ত্র, পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র ও জরায়ুর কিছু ক্যান্সারেও দেখা যায়। ফলে ভবিষ্যতে এসব ক্যান্সারের চিকিৎসাতেও এই ধরনের ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

নতুন চিকিৎসার দ্বার উন্মোচন
কেআরএএস আসলে আরও বড় একটি জিন পরিবারের অংশ, যেগুলোকে সম্মিলিতভাবে আরএএস মিউটেশন বলা হয়। বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০ শতাংশ ক্যান্সারের সঙ্গে এই মিউটেশন জড়িত। প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষের ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার পেছনে এ ধরনের জিনগত পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে।
দীর্ঘ চার দশক ধরে বিজ্ঞানীরা এই জিনগুলোকে লক্ষ্য করে ওষুধ তৈরির চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এগুলোকে কার্যকরভাবে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। নতুন এই সাফল্য সেই ধারণাকে বদলে দিয়েছে।
গবেষকদের মতে, এটি কেবল শুরু। ভবিষ্যতে আরও উন্নত সংস্করণের ওষুধ তৈরি হবে এবং নতুন নতুন ক্যান্সারের চিকিৎসায় এ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। এমনকি শিশুদের কিছু জটিল ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও এ ধরনের চিকিৎসা কার্যকর হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ক্যান্সারের একটি ধরনকে লক্ষ্য করে শুরু হওয়া এই গবেষণা শেষ পর্যন্ত কোটি মানুষের জন্য নতুন চিকিৎসার পথ খুলে দিতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















