গাছপালা স্থির জীব। তারা হাঁটতে পারে না, জায়গা বদলাতে পারে না। কিন্তু তাই বলে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা নেই—এমন ধারণা এখন আর টিকছে না। আলো, পানি, পুষ্টি ও পরাগায়নের সুযোগ দখল করতে গাছেরাও এক ধরনের নীরব লড়াই চালায়। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে গাছ শুধু নিজের পরিবেশই নয়, আশপাশের গাছের অবস্থাও ‘শুনে’ নেয় এবং সেই অনুযায়ী নিজের বৃদ্ধি ও প্রতিরক্ষা কৌশল বদলে ফেলে।
গবেষণার নতুন আবিষ্কার
গবেষকরা বহুদিন ধরেই জানতেন, গাছপালা বিভিন্ন রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। বিশেষ করে কোনো গাছে পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া কিছু রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে আশপাশের গাছ সতর্ক হয়ে যায় এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করে।
তবে সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় থাকা গাছও কি প্রতিবেশীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গবেষকরা নতুন পরীক্ষা পরিচালনা করেন।
বার্লি গাছ নিয়ে পরীক্ষা
গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন গতিতে বেড়ে ওঠা তিন ধরনের বার্লি গাছ ব্যবহার করা হয়। একটি দ্রুত বৃদ্ধি পায়, একটি ধীরে এবং অন্যটি মাঝারি গতিতে।
গাছগুলোকে আলাদা চেম্বারে রাখা হয়েছিল, যাতে তারা একে অপরের ওপর ছায়া ফেলতে না পারে। তবে প্রতিটি চেম্বার বাতাস চলাচলের বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে সংযুক্ত ছিল। ফলে এক চেম্বারের বাতাস অন্য চেম্বারে প্রবাহিত করা সম্ভব হয়।
২৫ দিন ধরে গবেষকরা পর্যবেক্ষণ করেন, প্রতিবেশী গাছের বাতাসের সংস্পর্শে এসে গাছগুলোর আচরণ কীভাবে বদলায়।
অবাক করা ফলাফল
গবেষণায় দেখা যায়, ধীরে বেড়ে ওঠা বার্লি গাছ যখন দ্রুত বাড়তে থাকা গাছের চেম্বার থেকে আসা বাতাসের সংস্পর্শে আসে, তখন তার বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত হয়। এমনকি তাদের জৈব ভর প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হয়।
গবেষকদের ধারণা, ধীরগতির গাছগুলো বাতাসে থাকা রাসায়নিক সংকেত থেকে বুঝতে পারে যে আশপাশে দ্রুত বাড়তে থাকা প্রতিযোগী রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে আলো থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে তারা দ্রুত বৃদ্ধির দিকে বেশি শক্তি ব্যয় করে।
অন্যদিকে দ্রুত বাড়তে থাকা গাছগুলো যখন ধীরগতির গাছের সংকেত পায়, তখন তাদের বৃদ্ধি কিছুটা কমে যায়। কারণ তাদের আর অতিরিক্ত দ্রুত বাড়ার প্রয়োজন থাকে না।
বৃদ্ধি নাকি প্রতিরক্ষা—কোথায় বিনিয়োগ?
গাছের টিস্যু বিশ্লেষণ ও জিনগত পরীক্ষা থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। ধীরগতির গাছগুলো যখন দ্রুত বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেয়, তখন তারা শক্তির বড় অংশ সেই কাজেই ব্যয় করে।
বিপরীতে দ্রুতগতির গাছগুলো তুলনামূলক কম বৃদ্ধির মাধ্যমে শক্তি সাশ্রয় করে এবং সেই শক্তি প্রতিরক্ষামূলক রাসায়নিক তৈরিতে ব্যবহার করে। এসব রাসায়নিক পাতা পোকামাকড়ের জন্য কম আকর্ষণীয় করে তোলে।
অর্থাৎ গাছ শুধু পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয় না, বরং প্রতিযোগীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে নিজেদের কৌশলও পরিবর্তন করে।
কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা
এই আবিষ্কার কৃষিক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। গবেষকরা মনে করছেন, বাতাসে ছড়িয়ে পড়া রাসায়নিক সংকেত ব্যবহার করে ফসলকে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত বৃদ্ধি বা শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উৎসাহিত করা সম্ভব হতে পারে।
যদি কোনো এলাকায় পোকামাকড়ের আক্রমণের আশঙ্কা থাকে, তাহলে ফসলকে আগে থেকেই প্রতিরক্ষামূলক রাসায়নিক উৎপাদনে উৎসাহিত করা যেতে পারে। আবার ঝুঁকি কম থাকলে দ্রুত বৃদ্ধি ঘটিয়ে ফলনও বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, গাছপালার নীরব জগৎ আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল, যেখানে তারা একে অপরের খবর রাখে, সংকেত বিশ্লেষণ করে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















