বিশ্ব আবারও এক শক্তিশালী এল নিনোর মুখোমুখি। জলবায়ুবিদদের আশঙ্কা, এবারের এল নিনো শুধু শক্তিশালীই নয়, বরং আধুনিক রেকর্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে তীব্র এল নিনো হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, অতিবৃষ্টি, দাবদাহ, দাবানল এবং খাদ্য সংকটের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
এল নিনো কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
শত শত বছর আগে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা লক্ষ্য করেছিলেন, কয়েক বছর পরপর হঠাৎ করে মাছের সংখ্যা কমে যায়। পরে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এটি একটি বৃহৎ জলবায়ুগত চক্রের অংশ, যা এখন এল নিনো নামে পরিচিত।
এল নিনো সাধারণত তখন ঘটে, যখন নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের ওপরের বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে। এই উষ্ণতা বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ধরণকে বদলে দেয় এবং এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে তাপ ও আর্দ্রতার বণ্টন পাল্টে দেয়।
রেকর্ড ভাঙার পথে?

বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ ভাগ এবং ২০২৭ সালের শুরুর দিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২.৫ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হতে পারে। সাধারণভাবে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে বিবেচিত হয়।
যদি এই পূর্বাভাস সত্যি হয়, তাহলে গত ৭৫ বছরের রেকর্ডে এটিই হবে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো। এর আগে ১৯৮২-৮৩ সালের এল নিনোকে সবচেয়ে শক্তিশালী ধরা হতো, যখন তাপমাত্রা বৃদ্ধি হয়েছিল প্রায় ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আরও উষ্ণ হতে পারে পৃথিবী
এল নিনো সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি না হলেও, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবকে আরও তীব্র করে তোলে। অতীতে শক্তিশালী এল নিনোর সময় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়েছে।
১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনোর পর ১৯৯৮ সাল সে সময়ের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হয়েছিল। একইভাবে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর পরও বৈশ্বিক তাপমাত্রা নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। বর্তমানে ২০২৪ সাল সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ডধারী। তবে জলবায়ু মডেলগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, ২০২৭ সাল সেই রেকর্ডও ভেঙে দিতে পারে।
কোথায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চল, সাহেল অঞ্চল, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং এশিয়ার কিছু অংশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এসব এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিতে পারে, যা কৃষি উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর চাপ বাড়াবে।
পূর্ব আফ্রিকার কিছু দেশে আবার উল্টো চিত্রও দেখা যেতে পারে। কয়েক মাসের খরার পর অতিবৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘ খরার পর মাটি শক্ত ও শুষ্ক হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত শোষিত হতে পারে না, ফলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ে।
খাদ্য সংকট ও মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা
বিশ্বের অনেক ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল ইতোমধ্যে যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও খাদ্য সংকটে ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন এল নিনো কৃষি উৎপাদন আরও কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে সার ও কৃষি উপকরণের ঘাটতি থাকায় অনেক কৃষক আগের চেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই খরা-সহনশীল বীজ ব্যবহার, পশুপালনের জন্য খাদ্য ও পানি সংরক্ষণ এবং আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। কারণ এল নিনোর প্রভাব শুরু হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ অনেক কমে যায়।
জলবায়ুবিদদের মতে, বিশ্ব যদি দ্রুত প্রস্তুতি না নেয়, তাহলে আসন্ন এল নিনো শুধু আবহাওয়ার ঘটনাই হবে না, বরং খাদ্য, অর্থনীতি এবং মানবিক সংকটেরও বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















